নিজস্ব প্রতিবেদক
বোনের শশুরের বর্বরতার শিকার হয়ে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছে শিশু আছিয়া। তার জন্য কাঁদছে দেশের মানুষ। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিও উঠেছে। তবুও ইউনূস সরকারের কোনো সাড়া নেই। এমনকি প্রধান উপদেষ্ট আছিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় এখনও নিশ্চুপ। সাধারণ মানুষের আবেগকে সম্মান জানাতে শহিদ মিনারে জানাজার দাবি করেছিল পরিবার, সেই অনুমতিও দেয়নি ইউনূস সরকার, যদি বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়!
এসব কারণে ক্ষোভে ফুঁসছে দেশবাসী। এবার এই বিক্ষুব্ধ জনতা শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।
১৩ই মার্চ, বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে বাড়িটিতে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।
এলাকাবাসীর সূত্রে জানা গেছে, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় নিহত শিশু আছিয়া খাতুনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার এশার নামাজের পর জানাজা শেষে আছিয়ার আদি নিবাস শ্রীপুরের সোনাইকুণ্ডীতে তাকে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে তার মরদেহ মাগুরায় নেওয়া হয়। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় মাগুরা শহরের নোমানী ময়দানে শিশুটির প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন।
শিশু আছিয়ার মৃত্যুর খবরে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও বিক্ষোভে অংশ নেয়। তারা সড়ক অবরোধ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেন।
মৃত্যুর খবর শোনার পরই আছিয়ার বাড়িতে যান এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজন, তারা স্বজনদের সহমর্মিতা জানান।
পড়ুন: মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ: উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
এদিকে, জানাজা শেষে আছিয়ার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার সোনাইকুণ্ডী গ্রামে। সেখানে আরেক দফা জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়। জানাজা শেষ ক্ষুব্ধ জনগণ অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন দেয়।
ধর্ষণের মামলায় আছিয়ার বোনের শ্বশুর, শাশুড়ি, স্বামী ও ভাসুরকে গ্রেপ্তারের পর বাড়িতে তেমন লোকজন ছিল না এসময়। জনতা বাড়িটি ভাঙচুর ও আগুন দেয়। এসময় তারা আছিয়ার নামে স্লোগানও দেন।
শিশু আছিয়া ধর্ষণ মামলার এজাহার
এজাহারে যা বলা হয়েছে:
গত চার মাস আগে মাগুরা পৌর এলাকার সজিব হোসেনের সঙ্গে আছিয়ার বড় বোনের বিয়ে হয়। সেই বাড়িতে স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও ভাশুর থাকে। বিয়ের পর থেকে বড় মেয়েকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল শ্বশুর হিটু শেখ। যা পরিবারের সবাই জানত। এ নিয়ে কয়েক দফা ঝগড়াও হয়েছে। এমন অবস্থায় ১লা মার্চ বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে যায় আছিয়া।
গত ৫ই মার্চ, বুধবার রাত ১০টার দিকে খাবার খেয়ে বড় বোন ও তার স্বামীর সঙ্গে একই কক্ষে ঘুমায় আছিয়া। রাত আড়াইটার দিকে বড় বোন ঘুম থেকে জেগে দেখেন, আছিয়া পাশে নেই, মেঝেতে পড়ে আছে। তখন সে বড় বোনকে জানায়, তার যৌনাঙ্গে ব্যথা। বড় বোন ভেবেছিল আছিয়া ঘুমের মধ্যে আবোলতাবোল বকছে। সকাল ৬টার দিকে সে আবার বোনকে ব্যথার কথা বলে। কারণ জানতে চাইলে বোনকে জানায়, রাতে ভগ্নিপতি সজিব দরজা খুলে দিলে শ্বশুর হিটু শেখ তার মুখ চেপে ধরে তুলে নিয়ে তার কক্ষে নিয়ে ধর্ষণ করে। সে চিৎকার করতে পারেনি, তার গলা চেপে ধরেছিল। পরে আহত অবস্থায় আবার বোনের কক্ষের মেঝেতে ফেলে রেখে যায়।
ঘটনা শুনে আছিয়ার বড় বোন তার মাকে ফোনে বিষয়টি জানাতে গেলে সজিব ফোন কেড়ে নিয়ে তাকে মারধর করে। কাউকে বললে আছিয়াকে খুন করার হুমকি দেয়। পরে দুই বোনকে আলাদা দুটি কক্ষে আটকে রাখে। সকালে এক প্রতিবেশী নারী বাড়িতে এলে রাতুল দরজা খুলে দেয়। অচেতন আছিয়ার মাথায় পানি দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে জাবেদা বেগম অন্য প্রতিবেশীদের সহায়তায় মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আছিয়াকে জিনে ধরেছে বলে জানায়। তবে চিকিৎসক ও অন্যরা ধর্ষণের আলামত বুঝতে পারায় জাবেদা বেগম হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যায়। পরে খবর পেয়ে আছিয়ার মা হাসপাতালে যান।
আছিয়ার বোনের ভাষ্য
আছিয়ার বড় বোন জানান, প্রায় ২০-২২ দিন আগে তার সঙ্গে একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে। সেদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে কেউ ছিল না। তিনি ঘরে আলো জ্বালিয়ে রেখে টয়লেটে যান। টয়লেট থেকে ফিরে দেখেন ঘরের আলো নেভানো। হঠাৎ কেউ একজন তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। উচ্চতা ও শরীরের গঠন দেখে বুঝতে পারেন শ্বশুর। ঘটনাটি তিনি সজিবকে জানালে সে উল্টো তাকে অপবাদ দিয়ে তাকে গালাগাল করে।
তিনি বলেন, এ ঘটনা বাড়িতে গিয়ে জানাই, সেখান থেকে আর শ্বশুরবাড়ি ফিরতে চাইনি। কিন্তু বাড়ি থেকে বুঝিয়ে আবার পাঠানো হয়। আমার মনে সব সময় ভয় কাজ করত, যদি আরও খারাপ কিছু ঘটে। তাই আমার সঙ্গে আমার ছোট বোনকেও পাঠায়। এখন সেও সর্বনাশের শিকার। এলাকার মানুষের কাছ থেকে শুনেছি, এর আগেও দুইটা মেয়ের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে শ্বশুর হিটু শেখ।
জানা যায়, আছিয়ার ভগ্নীপতি সজিব, তার ভাই রাতুল, তাদের বাবা হিটু শেখ ও মা জাবেদা বেগম— গ্রেপ্তারের পর কেউই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেনি। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কথাবার্তা অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী ছিল।
