বিশেষ প্রতিবেদন
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে দুই বছর পর গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বেরিয়ে এলেন সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় বন্দী ভয়ঙ্কর জঙ্গি মো. মহিবুল্লাহ।
৪ঠা ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার বিকেল ৪টার সময় কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের মূল ফটক দিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসেন তিনি।
মো. মহিবুল্লাহ (৫০) ভয়ঙ্কর জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার নায়েবে আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
মহিবুল্লাহর মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আরেকটি অংশ- বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দলোন-এর কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. আলতাফ হোসাইন।
মহিবুল্লাহকে বরণ করে নিতে আগে থেকেই কারাগারের সামনে অপেক্ষমান ছিলেন হিন্দাল শারক্বিয়াসহ আরও কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। তারা বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন-এর ব্যানারে জড়ো হন। মহিবুল্লাহকে বেরিয়ে আসতে দেখে ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দেন তারা। কেউ কেউ জঙ্গি নেতার মুক্তির খুশিতে শুকরিয়ার নামাজও পড়তে শুরু করেন রাস্তায় দাঁড়িয়ে। জঙ্গি নেতা মহিবুল্লাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন উপস্থিত জঙ্গি সদস্যরা।
জানা যায়, বেশ কিছুদিন ধরেই মহিবুল্লাহর জামিন নিয়ে কাজ করছিলেন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। তারা বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের সাথে মিলে ইউনূস সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তদ্বির করছিলেন। তাদের তদ্বিরের জোরেই জামিন পান মহিবুল্লাহ। কিন্তু জামিনের আদেশ কারাগার পর্যন্ত পৌঁছাতে কিছুটা বিলম্ব হওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষকে রীতিমত প্রাণনাশের হুমকি-ধমকিও দেওয়া হয়।

জঙ্গি নেতাকে বের করে আনার জন্য সংগঠনের তৎপরতা
মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে মহিবুল্লাহর মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করে বৈষম্যহীন কারামুক্তি আন্দোলন। সেখানে জঙ্গি সদস্যরা জড়ো হয়ে জেল সুপারের বিরুদ্ধে স্লোগান ও তাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
মানববন্ধনে বক্তৃতায় জঙ্গিরা বলেন, উচ্চ আদালত জামিন দিলেও বন্দিদের আটক রেখে জেলার ও জেল সুপার আদালত অবমাননা করছেন।
ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় একটি লাইভ ভিডিও। তাতে দেখা যায়, মহিবুল্লাহর জামিনের কাগজ কেন এখনও কারাগারে পৌঁছায়নি, এজন্য জেলারকে হেনস্থা করা হচ্ছে। তাকে যাচ্ছেতাই ভাষায় হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। যে ব্যক্তি জেলারকে নোংরা ও কদর্য ভাষায় শাসাচ্ছিলেন, তিনি হলেন আতাউর রহমান বিক্রমপুরী ওরফে আসাদুল্লাহ ওরফে আতাউর। তিনি জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) সদস্য। ইতিমধ্যে একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ৫ই আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতায় তিনি জেলের বাইরে রয়েছেন। তার জামিন আদেশ হয়েছে কিনা, এ প্রসঙ্গে তথ্য পাওয়া যায়নি। এবিটি’র নেতা জসিমউদ্দিন রহমানীও ৫ই আগস্টের পর জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
লাইভ ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। কীভাবে জঙ্গিরা কারা-কর্মকর্তাদের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে জঙ্গিদের বের করে নিয়ে যাচ্ছে, এ নিয়ে নেটিজেনরা প্রশ্ন তুলেছেন। সেই সাথে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও।
শেষপর্যন্ত জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার নায়েবে আমির মহিবুল্লাহকে নিয়ে বিজয় মিছিল করতে করতে জঙ্গি সদস্যরা কাশিমপুর কারা-প্রাঙ্গন ছেড়ে যান।
উল্লেখ্য, মো. মহিবুল্লাহ ওরফে ভোলার শায়েখ ভোলা জেলার সদর থানার চরসিফলি গ্রামের মৃত আব্দুর রব মাস্টারের ছেলে। তিনি ২০২৩ সালের মার্চে বিলাইছড়ি থানার সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তার হন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ডেমরা ও বিলাইছড়ি থানায় আরও দুটি মামলা ছিল।
৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন কারাগার ভেঙে জঙ্গিদের বের করে আনা হয়। শত শত দুর্ধর্ষ জঙ্গি এখনও পলাতক রয়েছেন। অনেককে জেল থেকে সসম্মানে বের করে আনে সংগঠনের অপর জঙ্গিরা। কারাগারের সামনে সেনাসদস্যরা জঙ্গি নেতাকে স্যালুট ঠুকছেন, এমন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হলে ‘জামিন করিয়ে’ বের করে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। একের পর এক জঙ্গিরা জামিন পেতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গত ৩০শে জানুয়ারি জামিন দেওয়া হয় মহিবুল্লাহকে।

মহিবুল্লাহর জঙ্গি কার্যক্রমের ফিরিস্তি
মহিবুল্লাহ জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়ার আধ্যাত্মিক নেতার ভূমিকা পালন করতেন। বৃহত্তর বরিশালজুড়ে ছিল তার বিশাল নেটওয়ার্ক। সেখানে ৫০-৬০ জন তরুণকে জঙ্গিবাদে প্রশিক্ষণ দেন তিনি। ঘরছাড়া তরুণদের ‘হিজরতকারী’ আখ্যা দিয়ে তাদের আশ্রয়-বয়ান দিয়ে ব্রেনওয়াশ করেন। পরে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাদের পাহাড়ের গহীন অরণ্যে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। তারপর ব্রেনওয়াশ করতেন।
২০২৩ সালে মহিবুল্লাহকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগের সিটি ইনভেস্টিগেশন টিম। রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তার কাছ থেকে ২টি মোবাইল ফোন এবং একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়।
সিটিটিসি’র প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামানের বরাতে জানা যায়, সিটিটিসির হাতে গ্রেপ্তার শুরা সদস্য ডা. শাকের ওরফে শিশির, পলাতক জঙ্গি নেতা শামিন মাহফুজ ও মহিববুল্লাহ ২০২২ সালের জানুয়ারিতে নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম পাহাড়ে একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যায়। সেখানে কেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট)-এর তত্ত্বাবধানে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ চলে। সেখানে তাদের সঙ্গে কেএনএফ-এর প্রধান নাথান বম ও অন্যদের সাক্ষাৎ হয়। পরে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বিয়া নাম রাখা হয় সংগঠনের।
সেখানেই শুরু কমিটি গঠন করে মহিববুল্লাহকে নায়েবে আমির নির্বাচিত করা হয়। ক্যাম্পে সন্ধ্যার পর মহিববুল্লাহ প্রশিক্ষণরত সদস্যদের বয়ান দিতেন। বয়ানের মূল উদ্দেশ্য ছিল— ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে জঙ্গি সদস্যদের জিহাদের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করা।
মহিববুল্লাহ পাহাড়ে কিছুদিন অবস্থান করার পর ঢাকায় চলে আসেন। শুরা কমিটির সদস্যদের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড চ্যাটের মাধ্যমে কার্যক্রম সমন্বয় করতেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দাওয়াতের মাধ্যমে সংগঠনের কার্যক্রম চালান তিনি। শুরা সদস্য ডা. শাকের ওরফে শিশিরকে দাওয়াতি কার্যক্রমে সহযোগিতা জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। শুরা সদস্যের সঙ্গে ঢাকা, সিলেট ও কিশোরগঞ্জে সংগঠনের কার্যক্রম জোরদার করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বৈঠকে অংশ নেন মহিবুল্লাহ।
মহিবুল্লাহ হাটহাজারীসহ বিভিন্ন মাদ্রাসাতেও নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। সেখান থেকে পেনড্রাইভের মাধ্যমে বিভিন্ন জিহাদি ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে, নিজের ল্যাপটপে সংরক্ষণ করতেন। জিহাদ বিষয়ে নিজের লেখা খসড়া কপিও তার কাছে পাওয়া যায় গ্রেপ্তারের সময়। ডা. শাকের সিটিটিসির হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর মহিববুল্লাহ নিজেকে আড়াল করতে সিম ও মোবাইল ফোন নষ্ট করে ফেলেন। পরবর্তী সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে মহিববুল্লাহকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় সিটিটিসি।
মহিববুল্লাহ সিটিটিসি-কে জানান, তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর আল জামেয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মইনূল ইসলাম মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি-বি)-এর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। তৎকালীন হুজি সদস্যদের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন মাদ্রাসায় জিহাদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হুজি নেতা মুফতি আব্দুর রউফ আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন স্থানে জিহাদে যাওয়ার ব্যাপারে হাটহাজারী মাদ্রাসা ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত বক্তব্য প্রদান করতেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের পক্ষে সশস্ত্র জিহাদে অংশগ্রহণের ডাক দিতেন। সে সময় হুজির অন্যান্য জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে মহিবুল্লাহর সরাসরি যোগাযোগ ছিল।
সিটিটিসি জানায়, শামিন মাহফুজ হাটহাজারী মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষ করেন। গোয়েন্দা নজরদারির কারণে হুজি-বি’র কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়লে তিনি এবং অন্য সদস্যরা নতুন করে জিহাদি কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা করেন। সেই লক্ষ্যে ২০১৭ সালে ভোলায় গিয়ে হুজির সাবেক নেতা মাইনুল ইসলাম ওরফে রক্সির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ক্রমে হুজির অন্য সদস্যরাও যুক্ত হন। সে থেকেই মাইনুল ইসলাম ও মহিববুল্লাহর নিয়মিত যোগাযোগ হয়। ২০২১ সালে মাইনুল গ্রেপ্তারের পর হুজির আরেক সদস্য রাকিবের সঙ্গে মুহিববুল্লাহর সংযোগ হয়। একইসাথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার কাজে সদস্য সংগ্রহ ও দাওয়াতি কার্যক্রম চালান তারা।
