ছাত্রলীগের ওনারশীপ আজীবনের। পর্ব ৭

ছাত্রলীগের ওনারশীপ আজীবনের। পর্ব ৭
শেয়ার করুন

৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে কর্মী হয়ে ছাত্রলীগকে আমি যেভাবে দেখি; যে ভাবনায় রাখি….

আমি আরাফ হোসাইন,  মফস্বলে সূচনা হলেও সংগত কারণেই বেড়ে ওঠাটা মফস্বল শহরের জনপদের সাথে। উত্তরাধীকারসূত্রে প্রত্যক্ষ  রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম না হলেও সম্ভ্রান্ত আচ থাকায় রাজনৈতিক সচেতনতার দীক্ষা নিতে বেগ পেতে হয়নি। প্রাথমিকে কপালে টিপ আর স্কুল ব্যাগ কাধে নেভী ব্লু রঙের শর্টপ্যান্টের পকেটে হাত রেখে ক্লাস টপার আমি মাধ্যমিকে উঠে মিছিলের সাথে হাটতে হাটতে নিজের অগোচরে ছাত্রলীগের দীক্ষায় ধারণ করে ফেলেছি। তারপর আজ অব্দি সময়ের সাথে সাথে ছাত্রলীগকে দেখেছি, বুঝতে গেছি, শিখতে চেষ্টা করেছি, অনুভূতিতে গেথেছি। ছাত্রলীগের চেতনাধারী সমস্ত শ্লোগান উচ্চকন্ঠে দিকবিদিক প্রতিধ্বনিত করেছি। ক্ষমতার সাথে গা ভাসানোর জন্য ছাত্রলীগকে বেছে না নিয়ে আদর্শিক ভাবদ্বারায় অনুপ্রাণিত করেছি। রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগকে ওউন করি বলেই সমাজে/সার্কেলে ছাত্রলীগের আদর্শিক বৃত্তান্তের পদছাপ রাখার চেষ্টায় নিজেকে জাগ্রত রাখি; ছাত্রলীগের মান সমুন্নত রাখবো বলে।

ছাত্রলীগের আবেগ,অনুভূতি মসৃণ রাখতে- আমার যে বন্ধু ক্যাম্পাসে তার মেয়ে বন্ধু নিয়ে আড্ডা দিতো আমি সেই সময়ে ছাত্রলীগের মিছিলে জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু, শিক্ষা শান্তি প্রগতির স্লোগান দিয়েছি। আমার পাশে রাত জেগে চ্যাটিং করতো, ফোনে কথা বলতো আমি রাজনীতির বিষয়বস্তুতে চোখ বোলাতাম, সোস্যাল মিডিয়ায় কুৎসার যৌক্তিক জবাব দিতাম, সংগঠনের প্রচার করায় ব্যায় করতাম। নিজের কত অভ্যাস বদলেছি, নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ করেছি এই সংগঠনের প্রতি ঝোক থেকে, সেই স্যাক্রিফাইসের আসক্তি থেকে বেরোনো দুঃসাধ্য। মনেপ্রাণে ধারন করতাম ছাত্রলীগের একজন কর্মী অর্ডিনারী স্টূডেন্টসদের কাছে অনুকরণীয় হবে। তার আচরণ ও ব্যাক্তিত্বের প্রতি কনভিন্স হয়ে অন্যরা ছাত্রলীগের সাথে নিজের আদর্শের সূচনা ঘটাবে। ছাত্রলীগকে যেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বুঝতে শিখেছি নিজের মধ্যে সেভাবেই গড়ে তোলার প্রয়াস জাগাতাম; যেভাবে ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ইতিবাচক হবে। আমার বিশ্বাস এই ধারণা প্রত্যেক ছাত্রলীগের কর্মীর মধ্যে থাকা উচিত।

প্রাচীণ এবং উদার চিন্তা ও কর্মের উপরে গড়া ঐতিহ্যের মিশেলে যে ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের আমার মতো অসংখ্য স্কুল/কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের মনেযোগ ও আবেগের স্থানে পরিণত হয়েছিল তার নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৪৮ এর ৪ঠা জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা ও প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে “শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি” এই তিন মূলনীতি ঘিরে একদল অগ্রগামী তারুন্যের উপস্থিতিতে ছাত্রলীগ সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিলো। তার পরের উল্লেখযোগ্য ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোল থেকে ৬৯ এর গনভ্যুথান, ৭০ এর নির্বাচনে ছাত্রলীগের তাৎপর্যপূর্ণ সাংগঠনিক উপস্থিতি, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা, ৯০ এর গন আন্দোলন, ২০০৭ এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগের ত্যাগ-সংগ্রাম, সৃজনশীলতা ও গৌরবান্বিত ইতিহাস এই সংগঠনে যে মর্যাদার পালকগুলো একে একে যুক্ত করেছিলো তা এই সংগঠনের প্রতি অবশ্যই বাজারের অন্য ছাত্রসংগঠনের চাইতেও উচ্চতর মনোভাব তৈরি ও প্রাসঙ্গিক করে তোলে।

উপরোক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী  নানান রাজনৈতিক সংকট/ঘটনা-পরিক্রমার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি হিসেবে ছাত্রলীগের অগ্রগামী ভূমিকা যে আলোকিত আদর্শের জন্ম দিয়েছে এবং ধীরে ধীরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আদর্শিক সংগঠন হিসেবে নিজের ভিত্তি দাড় করেছে।  ২০০৯ পরবর্তী সময়ে যে অর্জন পুরোপুরি অম্লান না হলেও তিন মূলনীতির একটি যথা প্রগতির শর্তকে বাস্তবায়ন পথ হারিয়েছে  কিংবা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব সেই চেষ্টায় নিজেদের নিয়োজিত করতে পারেননি। কোথাও যেনো ছাত্রলীগের মধ্যে প্রগতি থেমে গিয়েছিলো। একইসাথে গ্রুপিং, ক্ষমতার বন্টনে অভ্যন্তরীণ শান্তি যেমন বিনষ্ট হচ্ছিলো তেমনি সুশিক্ষা অর্জনে ছাত্রলীগের মেধা-মননকে প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ততা অথবা উদাসীনতা লক্ষ্যনীয়। এই তিন মৌলনীতির শূন্যতা সৃষ্টির ফলে ছাত্রলীগের আদর্শিক বিচ্যুতি ছাত্রলীগের অর্জনের ধারাবাহিকতাকে দূর্বল করে ফেলেছে। তদুপরি করোনা মহামারীর বিপর্যয়ের সময়ে ছাত্রলীগের মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাকে আশাবাদী করে। আমি বিশ্বাস করি ছাত্রলীগ এই দেশের মানুষের সামগ্রিক কল্যাণের প্রয়োজনে ঘুরে দাড়াতে পারে।

আমার কাছে ছাত্রলীগ শুধু সংগঠন নয়, ছাত্রলীগ একটি দেশপ্রেমের আদর্শবাহী ও আবেগ, অনুভূতির সম্মিলিত সাংগঠনিক উপস্থিতি। ছাত্রলীগের সাথে দীর্ঘ ১ যুগের এই পথচলায় সাংগঠনিক প্রাপ্তি শূন্য। কারণ হয়তো যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হতে পারিনি অথবা বিগত দিনে অজস্র আদর্শিক/অনাদর্শিক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে ছাত্রলীগের মতো বিশাল সংগঠনে আমাদের মতো ক্ষুদ্র কর্মীদেরকে চোখে পড়েনি, নূন্যতম পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। এই প্রাপ্যতার হিসেব কষা নিয়ে আক্ষেপ-অভিমানের সৃষ্টি হলেও নিজের কাছে মনে হয় বৃহৎ স্বার্থে স্বপ্রণোদিত হয়েই ছাত্রলীগের প্রতি নিজের সমস্ত মেধা, চিন্তা, দর্শন, ঘাম, অর্জনকে উজার করে বিলায়ে দেই।

আমার ভাবনায় আগামীর ছাত্রলীগের পরিমার্জন:-

★ক্ষমতাসীন অতীতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রের সাথে জেলা- উপজেলার নেতৃত্বের মধ্যে দুরুত্ব ও ছাত্রলীগকে সেন্ট্রালাইজড করায় নেতৃত্ব আশানুরূপ বিকশিত হতে পারেনি। এই দুরুত্ব কমাতে আগামীর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ তার অধস্তন ইউনিটের প্রতি অনৈতিক ছড়ি ঘোরানো বুর্জোয়া ভঙ্গি দূর করে দায়িত্বশীল ও বিনীত ভূমিকা নিতে হবে।

ছাত্রলীগের নেতৃত্ব যাচাইয়ের মানদণ্ড শুদ্ধ ও স্বাধীন না হওয়ায় ছাত্রলীগের মধ্যে অনাদর্শিক দুর্বৃত্তায়ন জায়গা করে নিয়েছিলো। এক্ষেত্রে এমনটার পুনরাবৃত্তি রোধে ভবিষ্যতে ছাত্রলীগকে আদর্শিক চর্চা ও নিয়মতান্ত্রিকতা রক্ষার পথে রাখতে হবে।

বাংলাদেশ আওয়ামিলীগ তার ভাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্য পরিচালনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা, মর্যাদাপূর্ন অংশীদারিত্ব প্রদান ও দায়িত্বশীল আচরণ করবে। একইসাথে ছাত্রলীগের মধ্যে কর্মকাণ্ডের পর্যবেক্ষণ ও নেতৃত্বের জবাবদিহিতা রক্ষায় নো কম্প্রোমাইজ নীতিতে ব্যাক্তিগত স্বার্থের উর্ধ্বে দলীয় স্বার্থ রক্ষা করবে।

লক্ষ্য করলে- গত একযুগ আগের আদমশুমারীর সাথে বর্তমান জনসংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেশে আনুমানিক প্রায় চার কোটি জনসংখ্যা বেড়েছে। এই সময়কার প্রজন্মের মধ্যে জানান দেয়া, তাদের কাছে গিয়ে বোঝানো যে কেনো ছাত্রলীগ করা উচিত এবং ছাত্রলীগের আদর্শকে ধারণ করা উচিত। সেই কাউন্সিলিং করার জন্য অনলাইন/অফলাইনে পাঠচক্র, সভা, সেমিনার সহ শিক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো ও সেসবের বাস্তবিক মিল তুলে ধরা।

একজন মানুষকে দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে ছাত্রলীগ হলো প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা। বাংলাদেশের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে ছাত্রলীগের প্রতি এক্ষেত্রে পূর্ন সহযোগিতা ও সমর্থন রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ একটি সর্ববৃহৎ ও সমৃদ্ধশালী সংগঠন। এই সংগঠন সকল শ্রেনীর ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করে এবং ছাত্রলীগের আদর্শে উদ্বুদ্ধদের উদারতার সাথে স্বাগত জানায়। এই উদারতার সুযোগ নিয়ে অনেকে ছুপা ও স্বার্থান্বেষী ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করে। নৈতিক পরাজয়ের শোধ নিতেই ছাত্রলীগকে নিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়ায় প্রতিপক্ষরা। ছাত্রলীগের মধ্যে কিছু চিটার জন্ম নেয় তা ঠিক তবে তা দিয়ে গোটা ছাত্রলীগের অর্জনকে বিবেচনা করা যাবেনা।

সবশেষে, গত ১৫ বছরের ভূল, বিচ্যুতি, অপ্রাপ্তি ভূলে গিয়ে আজ ৪ঠা জানুয়ারি ৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে ছাত্রলীগ তার ক্রান্তিকাল পার করছে। অতীতেও বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ও বঙ্গবন্ধুর সাহসী ভ্যানগার্ড ছাত্রলীগ দেশের সকল সংকটে অপশক্তি নির্মূলের সংগ্রামে দৃঢ়চেতা থেকে লড়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৭ হাজার সক্রিয় ছাত্রলীগ সদস্যের আত্মত্যাগে পাওয়া বাংলাদেশ আজ দেশবিরোধী শক্তির কালো ছায়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন। আমি প্রত্যাশা করি ঐক্যবদ্ধ ও দেশপ্রেমিক ছাত্রলীগের আদর্শিক শক্তির কাছে পরাজয় হবে এই মাতৃভূমির ষড়যন্ত্রকারী শত্রুদের।”

৪ঠা জানুয়ারি ২০২৫
– আরাফ হোসাইন, ভোলা জেলা ছাত্রলীগ কর্মী

Visited 112 times, 1 visit(s) today