বাঙালির স্বাধীনতা ও স্বাধিকার অর্জনের লক্ষে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ৪ঠা জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।প্রতিষ্ঠার সময় নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ।পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের পর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের পরিবর্তে হয় “বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় বলতেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস’।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন,তখনও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবি দিয়েছিলেন, যা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন আরো বেগমান হয়। তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাহসী আন্দোলন বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রাণিত করেছিলো।
১৯৬৯ সালে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালে বাংলার ছাত্রসমাজ সারাদেশে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলে, যা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ বাংলার ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন, যা ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের গতিকে আরো ত্বরান্বিত করে।
১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে তৎকালীন ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভ্যানগার্ড হিসেবে ছাত্রলীগ কাজ করত। সারা বাংলাদেশে পাকিস্তানের অপশাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্বাচিত করতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছাত্রলীগ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে, যার মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের গতি ত্বরান্বিত হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের ২৮ হাজার নেতাকর্মী শহীদ হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। নূরে আলম সিদ্দিকী, তোফায়েল আহমেদ-সহ তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রতিটি জেলায়, উপজেলায়, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।
জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ ও যুক্ত করার ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি। ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের আত্নত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত লাল-সবুজের পতাকা আমরা পেয়েছি, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ একটি দেশ হিসেবে স্থান পেয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় নয়, মানবিক দিকে দিয়েও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভূমিকা অতুলনীয়।মানবতার সেবায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সর্বদা প্রস্তুত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ-সামগ্রী বিতরণ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, তাদের জান-মাল রক্ষা, নিরাপদ পুনর্বাসন ও সার্বিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করতে বদ্ধপরিকর।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে ত্রাণ-সামগ্রী বিতরণ কর্মসূচিতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ মনোনীত জেলাভিত্তিক বিশেষ প্রতিনিধি দলের তালিকা করে কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ প্রদান করে। প্রতিনিধি দলের সকল সদস্যদের উল্লেখিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় উপস্থিত থাকে এবং তারা তাদের নিজেকে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রাখেন। বন্যার্তদের ও ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও নদীর বাদ নির্মাণও কাজেও উল্লেখ্য ভূমিকা রাখে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ছাত্রনেতারা নিজেদের উজাড় করে দিয়ে সততা,নীতি,ত্যাগ,শ্রম আর মেধাকে পুঁজি করে ছাত্রলীগের পতাকার মান অক্ষুণ্ণ রাখে।
যারা ব্যক্তি সার্থে ছাত্রলীগ করে তারা কখনোই ছাত্রলীগ ছিল না। কারণ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সংগঠন।
আর প্রকৃত ছাত্রলীগ তারাই যারা বঙ্গবন্ধুর মতো সর্বদা পরের তরে।
পরিশেষে,
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ইতিহাসে যেমন হাজার হাজার যোগ্য নেতার জন্ম হয়েছে তেমনই কিছু সংখ্যক অযোগ্য নেতারও জন্ম হয়েছে।
যার কারণে মাঝে-মধ্যে বিতর্কিত হতে হয় বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এই প্রাণের সংঠনটিকে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সকল ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন করে আগামীদিনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও দিক নির্দেশনায় কাজ করে বাংলাদেশের সুনাম অক্ষুন্ন রাখবে ইনশাল্লাহ।
শৈশবের লালিত স্বপ্ন,কৈশরের উচ্ছাস,তারুণ্যের অদম্য সাহস,আবেগ,ভালোবাসা,শুদ্ধতম আস্হা ও বিশ্বাসের ঠিকানা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গৌরব ঐতিহ্য সংগ্রাম ও সাফল্যের ৭৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সফল হোক, স্বার্থক হোক।
- মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন রনি, সাবেক সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ
