সংবাদ প্রতিবেদন
৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রাজধানীসহ সারা দেশে দুই হাজারেরও বেশি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। এসব ভাস্কর্য ও ম্যুরালের বেশির ভাগই ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। ধ্বংসের তালিকায় রয়েছে ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শশীলজের ভেনাসের মূর্তি, রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের থেমিস ও শিশু একাডেমির দুরন্ত ভাস্কর্যটিও।
৫ই আগস্টের পর সংঘটিত হামলাগুলোয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ধর্মীয় উপাসনালয়েও হামলা করে অসংখ্য প্রতিমা ও ধর্মীয় প্রতিকৃতি ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে তা এই ভাস্কর্যের হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায় ৫ থেকে ১৪ই আগস্টের মধ্যে ৫৯টি জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য (সিরামিক বা টেরাকোটা দিয়ে দেয়ালে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা অবয়ব), ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলার তথ্য পেয়েছেন। বেশির ভাগ ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে ৫, ৬ ও ৭ই আগস্ট।
ঢাকা মহানগর এলাকার ১৫টি স্থানে ১২২টির বেশি ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও রিলিফ ভাস্কর্য ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিপূর্ণ অবয়ব কাঠামোর ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে ৭টি। ঢাকা বিভাগে ২৭৩টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০৪, রাজশাহীতে ১৬৬, খুলনায় ৪৭৯, বরিশালে ১০০, রংপুরে ১২৯, সিলেটে ৪৯ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৯২টিসহ মোট ১ হাজার ৪৯২টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে, উপড়ে ফেলে এবং আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে।

এছাড়া মেহেরপুরের ‘মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স’কে একক ভাস্কর্য হিসেবে ধরা হলেও সেখানে ছয় শতাধিক পৃথক ভাস্কর্য ছিল। সেগুলোও ভেঙে ফেলা হয়। এই হিসেবে ধ্বংস করা ভাস্কর্যের সংখ্যা গিয়ে ঠেকে দুই হাজারেরও বেশি।
এসব ছাড়াও ব্যক্তি-মালিকানাধীন বাড়িঘর বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন আরও অসংখ্য ম্যূরাল, ভাস্কর্য রয়েছে, সেগুলোও আক্রোশের কারণে ভাঙা হয়েছে। এর সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।
দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকা গত ৭ই নভেম্বর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ১৫ বছরে সারাদেশে তৈরি হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ১০ হাজারের বেশি ম্যুরাল ও ভাস্কর্য। যার অধিকাংশই ভেঙে ফেলা হয়েছে। আর যা ভাঙা সম্ভব হয়নি, সেসব বিকৃত করা হয়েছে। এই হিসেব আমলে নিলে দুই হাজার ভাস্কর্য ভাঙার উপাত্তটি বাতিল হয়ে যায়। তাই বলা যায়, প্রকৃত সংখ্যা এখনও রয়ে গেছে অগোচরে।
তবে কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে দাবি করা বঙ্গবন্ধুর ১০ হাজারেরও বেশি ভাস্কর্য তৈরির এই তথ্যটি সঠিক নয় বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রতিবেদনটি পক্ষপাতদুষ্ট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ উঠেছে এরইমধ্যে।
কেননা, ২০২১ সালের মার্চে উচ্চ আদালতে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে বঙ্গবন্ধুর মোট ১ হাজার ২২০টি ভাস্কর্য ও ম্যুরাল আছে। বিভিন্ন দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য ভাস্কর্য ও ম্যুরালের মধ্যে খুলনা বিভাগে ২১টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২টি, ঢাকা বিভাগে ৪১টি, বরিশাল বিভাগে তিনটি, ময়মনসিংহ বিভাগে পাঁচটি, রংপুর বিভাগে চারটি, রাজশাহী বিভাগে ৯টি এবং সিলেট বিভাগে একটি স্থাপন করা হয়।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক বাড়ি- যাকে শেখ হাসিনা জাদুঘরে রূপান্তর করেছিলেন, সেখান হামলা–ভাঙ্চুরের সময় ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে দুটি বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল। রাজধানীতে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত পাঁচটি বিশালাকৃতির ভাস্কর্যের স্থান ঘুরে দেখা যায়, কোথাও হাতুড়ি-শাবল দিয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে, কোথাও উপড়ে ফেলা হয়েছে, কোনো কোনো ভাস্কর্য পোড়ানো হয়েছে আগুনে।
পলাশীর মোড়ে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী শামীম শিকদার নির্মিত ‘স্বাধীনতাসংগ্রাম’ স্থাপনায় ছোট-বড় শতাধিক পৃথক ভাস্কর্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত অক্ষত ছিল মাত্র পাঁচটি। বাকিগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে। ১১ই আগস্ট দুপুরে দেখা যায় মাটিতে লুটাচ্ছে দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক, বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানীদের আবক্ষ ভাস্কর্য। এর মধ্যে আছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে ইয়াসির আরাফাত, জগদীশচন্দ্র বসু থেকে লালন।
হলি আর্টিজানের জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে শহিদ দুই পুলিশ সদস্যের ভাস্কর্য গড়া হয়েছিল, সেই ভাস্কর্যগুলোও ভেঙে সেখানে জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের ব্যানার লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল ৫ই আগস্ট।

শিশু একাডেমি চত্বরের ‘দুরন্ত’ পুড়ে যাওয়ার খবর জানা যায় ৮ই আগস্ট। সেদিন বিকেলে শিশু একাডেমিতে গিয়ে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে আছে দুরন্তর অঙ্গার শরীর। অক্ষত ছিল শুধু শিশু মুখটুকু। কাঠি দিয়ে চাকা নিয়ে ছুটে চলা কিশোরের দুরন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। পাশে থাকা শেখ রাসেলের ম্যুরালটিও পুড়ে ছাই।
বিজয় সরণিতে বঙ্গবন্ধুর ‘মৃত্যুঞ্জয়’ ভাস্কর্য স্থাপিত হয় সাম্প্রতিক সময়ে। গত বছরের ১০ই নভেম্বর ‘মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণ’ উদ্বোধন করা হয়। ৫ই আগস্ট বিকেলে বিশাল অবয়বের এই ভাস্কর্যটি ভাঙা হয়। দড়ি বেঁধে টেনে, আগুন দিয়ে, শাবল চালিয়ে ধ্বংস করা হয় মৃত্যুঞ্জয়।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে স্থাপিত থেমিসের ভাস্কর্যটি উপড়ে ফেলা হয়েছে দুই পর্বে। এই ভাস্কর্য নিয়ে ২০১৬ সাল থেকেই ছিল নানা মতবিরোধ। গ্রিক দেবী থেমিসের আদলে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা এই ভাস্কর্যের হাতে ছিল ন্যায়দণ্ডের প্রতীক। ৭ই আগস্ট উপড়ে ফেলা হয় এটি।

মেহেরপুরের ‘মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স’কে একক ভাস্কর্য হিসেবে ধরা হলেও সেখানে ছয় শতাধিক পৃথক ভাস্কর্য ছিল। কমপ্লেক্সের অন্তত ৩০৩টি ছোট–বড় ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। সবার আগে ভাঙা হয় বঙ্গবন্ধুর বিশাল ভাস্কর্যটি। ৫ই আগস্ট বিকেল পাঁচটার দিকে শতাধিক যুবক রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটির মাথা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। একইসময় এলোপাথাড়ি আঘাত করে ‘১৭ই এপ্রিলের গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্যটিতে।
ময়মনসিংহের শশীলজে থাকা ভেনাসের ভাস্কর্যটি ভাঙা হয়েছে, চুরি হয়েছে মাথাটি। শশীলজের জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, শত শত লোক দলবেঁধে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। ভাস্কর্যের মাথার অংশ পাওয়া যায়নি। এটি অমূল্য সম্পদ ছিল।
এ শহরে জয়নুল সংগ্রহশালার সামনে থাকা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ মূর্তিটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় শিল্পীরা পরে তা সংস্কার করেছেন।
খুলনায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুটি ভাস্কর্য পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে। জেলা শহর মাদারীপুরে নির্মাণাধীন মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতিকেন্দ্রের নাম ছিল ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’। শহরের প্রাণকেন্দ্র শকুনির লেকপাড়ে অবস্থিত এই স্মারকের ভেতরের সবকিছু নষ্ট করা হয়েছে ৭ই আগস্ট বিকেলে।
৫ই আগস্টের পর গাজীপুরে তিনটি স্থানে ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭ বীরশ্রেষ্ঠের রিলিফ ভাস্কর্য। এটি ছিল জয়দেবপুরের ভেতরের দিকে। সিলেটে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থাকা ১২টির বেশি ম্যুরাল ভাঙা হয়েছে। এর সব কটিই বঙ্গবন্ধুর। নরসংদীতে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘তর্জনী’ নামে পরিচিত ভাস্কর্যটি। সেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণের একটি আঙুল তুলে রাখা সেই দৃশ্যের অনুকরণে তর্জনী বানানো হয়েছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের মূল ফটকে থাকা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালটি ভাঙা হয়েছে ১৪ই আগস্ট রাতে। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ১৫-২০ জন এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গেটের সামনের লাইটটি বন্ধ করে হল গেটের বঙ্গবন্ধু ম্যুরালটি ভাঙা শুরু করে। কর্তব্যরত নিরাপত্তারক্ষীকে দূরে সরিয়ে দিয়ে তারা হলের নামফলকটিও ভেঙে দেন।

চট্টগ্রামের পোর্ট কানেক্টিং রোডে অবস্থিত ২৬ ফুট উঁচু বঙ্গবন্ধুর ‘বজ্রকণ্ঠ’ ভাস্কর্যটিও ভেঙে ফেলা হয়। বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায় কয়েকটি বুলডোজার ও ক্রেন দিয়ে ভাস্কর্যটি ভাঙা হচ্ছে। ভাঙার পূর্বে সেই ভাস্কর্যের ওপর উঠে সেখান থেকে কয়েকজনকে প্রস্রাব করতেও দেখা গেছে এসব ভিডিওতে। এই ভাস্কর্যটি ভাঙা হয় ৬ই আগস্ট।
৫ই আগস্টের পর বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভেঙে ফেলা ছাড়াও বিভিন্ন অফিস থেকে নামিয়ে ফেলা হয় শেখ হাসিনা এবং শেখ মুজিবের ছবি। আর এই অবমাননার পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ‘মাস্টারমাইন্ড’ খ্যাত সহকারী ও উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।
তিনি তার ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে বলেছেন, শেখ মুজিব ও তার কন্যা (আরেক শেখ) তাদের ফ্যাসিবাদী শাসনের জন্য জনগণের তীব্র রাগ-ক্ষোভের মুখে পড়েছেন। একাত্তরের পর শেখ মুজিব নিজেই একজন স্বৈরশাসক হয়ে ওঠেন। মুজিববাদের প্রতি তার সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতায় একাত্তরের পর পঙ্গু ও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ ও শেখ পরিবারের সদস্যদের বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। অতীত কৃতকর্মের জন্য মুজিব ও হাসিনার ছবি, ম্যুরাল ও ভাস্কর্য মানুষ নামিয়ে ফেলেছে।
