গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাঃ “থলে ভরা টাকা খরচ করেও থালা ভরে না”

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাঃ “থলে ভরা টাকা খরচ করেও থালা ভরে না”
শেয়ার করুন

-দ্যা গার্ডিয়ান

ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের জনজীবন ও অর্থনীতি গভীর চাপে পড়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান। ১৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং সরকারি জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা মিলে সংকটকে আরও তীব্র করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম: “‘আমি এক থলে টাকা খরচ করি, তবু থলে ভরে না’: বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে জ্বালানি সংকট।”

রাত ১টায় রান্না

প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে ঢাকার ব্যাংককর্মী হালদারের (৩৪) গল্প দিয়ে। প্রতিদিন রাত ১টায় অ্যালার্ম বাজলে তিনি উঠে রান্নাঘরে যান। প্রায় চার কোটি মানুষের শহর ঢাকায় এখন কেবল এই সময়েই পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ রান্নার জন্য যথেষ্ট থাকে। হালদার বলেন, “আমি সরকারের কাছে অসাধারণ কিছু চাই না। চুলা জ্বালালে গ্যাস চাই, বাতি জ্বালালে বিদ্যুৎ চাই, কল খুললে পরিষ্কার পানি চাই। এগুলো বিলাসিতা নয়।” তিনি জানান, কোনো কোনো রাতে তিন ঘণ্টা, এমনকি তারও কম ঘুমান। তারপরও তাঁকে মা, গৃহিণী ও অফিসকর্মীর ভূমিকা একসঙ্গে সামলাতে হয়।

সংকটের পটভূমি

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আন্দোলনে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পেরিয়ে ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার নির্বাচিত হয়। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানে যুদ্ধ শুরু হয়। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে গ্যাস আমদানি ব্যাহত হয়। নির্বাচিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারকে এই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে, যা সামলাতে তারা হিমশিম খাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের পদক্ষেপ

সরকার জ্বালানি রেশনিং শুরু করেছে। দোকান, বাজার ও শপিং সেন্টার রাত ৮টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা আগের চেয়ে এক ঘণ্টা আগে। আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। শুধু হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, খাদ্যের দোকান ও জরুরি সেবা এর বাইরে।

গ্রামে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন

আগস্টে গ্রামাঞ্চলে মানুষ দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছাড়া ছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে খারাপ সময়ে জাতীয় লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। রাজধানীতে পরিবর্তন সবচেয়ে নাটকীয়। মোহাম্মদপুর, কাওরান বাজার ও ধানমন্ডির মতো অফিস ও ব্যবসাকেন্দ্রিক এলাকার দীর্ঘ সড়ক এখন অস্বাভাবিক অন্ধকার।

গ্যাসের সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান

বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১০৭ থেকে ১১৩ মিলিয়ন ঘনমিটার, অথচ সরবরাহ মাত্র প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ঘনমিটার। দেশে জ্বালানি উৎপাদন কম, তাই প্রায় অর্ধেক জ্বালানি সরবরাহের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। জুলাই থেকে আগস্টে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে গেছে। ২১ জুলাই আগুন লেগে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। কারখানাগুলোকে ব্যয়বহুল জেনারেটর চালাতে, উৎপাদন কমাতে, এমনকি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়েছে।

অর্থনীতিতে প্রভাব

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনায় জ্বালানি ব্যবস্থার যে দুর্বলতা আগে থেকেই ছিল, এই বিপর্যয় তা আরও বাড়িয়েছে। বস্ত্র, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, পরিবহন, কৃষি, মৎস্য ও সাধারণ বাণিজ্যিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর ভাষায়,
“প্রায় সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম মাত্রায় চলছে।”

খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি

ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) নামের বৈশ্বিক পুষ্টি পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ মাসগুলোয় প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। গ্রীষ্মে এই সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ, অর্থাৎ ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি।

দৈনন্দিন জীবনের হিসাব-নিকাশ

সংকটে মানুষকে প্রতিনিয়ত হিসাব কষতে হচ্ছে: কখন গ্যাসের চাপ রান্নার মতো হবে, গরমে পাখা কতক্ষণ চালানো যাবে, পেট্রল পাম্পে লাইন কত লম্বা হবে। মোহাম্মদপুরে বৈদ্যুতিক কাজের ওয়ার্কশপ চালান ৫০ বছর বয়সী আহমেদ। থাকেন শহরের প্রান্তে কেরানীগঞ্জে, যেখানে বাসাভাড়া কম। বছরের পর বছর যে যাতায়াত তিনি সামলে এসেছেন, এখন তা তাঁর কাছে আতঙ্কের। দোকান বন্ধ করার পর যানবাহন পাওয়া কঠিন, ভাড়াও বেশি, আর অন্ধকার রাস্তায় ছিনতাইয়ের ভয় কাজ করে। তিনি বলেন,
“সারা পথ ভাবতে থাকি, কেউ থামাবে কি না, টাকা-ফোন কেড়ে নেবে কি না।” মাঝে মাঝে দেশ ছাড়ার কথা ভাবেন, কিন্তু ৫০ বছর বয়সে সেই সামর্থ্য নেই। ভাবেন, তারপর মনে হয় যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।

বাজারের চাপ

ঢাকার কৃষি মার্কেটে রাস্তার পাশে চা ও খাবারের দোকান চালান ৪১ বছর বয়সী আলেয়া বেগম। এই আয়েই তাঁর ছেলের পড়াশোনার খরচ চলে, মেয়ের বিয়ের জন্যও তিনি সঞ্চয় করছিলেন। সবজির দাম এত বেড়েছে যে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সবজি কেনাই কঠিন। তিনি বলেন, “আগে অল্প টাকায় থলে ভরে সবজি কিনতে পারতাম। এখন এক থলে টাকা খরচ করেও থলে ভরে না।” মাছ-মুরগি কমিয়ে দিয়েছেন, ডিম কিনতেও দুবার ভাবতে হয়।
বিদ্যুতের ঘাটতির পরিসংখ্যান বা সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নাকি বিদেশি ঘটনার ফল, এই বিতর্কে তিনি মনোযোগ দেন না। তাঁর কথা:
“সরকার অনেক কিছু বলতে পারে, আমরা দেখি বাজার। দাম না কমলে আর জীবন সহজ না হলে কীভাবে বুঝব কিছু বদলেছে? আমার বড় প্রতিশ্রুতি লাগে না। আমি চাই বাজারে গিয়ে পরিবারকে খাওয়াতে পারি এবং আগামীকাল কীভাবে চলবে সেই দুশ্চিন্তা ছাড়া বাড়ি ফিরতে পারি।”
Visited 6 times, 1 visit(s) today