‘দ্রুত খুলবে’ বলা সেই মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার এখনো অন্ধকারে

‘দ্রুত খুলবে’ বলা সেই মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার এখনো অন্ধকারে
শেয়ার করুন

প্রতিশ্রুতির কয়েক মাস পরও নেই কর্মী পাঠানোর দিনক্ষণ
দুই লাখ কর্মীর ঘোষণাও নাকচ করল মালয়েশিয়া

❐ বিশেষ প্রতিবেদক


ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। সেই প্রতিশ্রুতির পর কেটে গেছে কয়েক মাস, প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে হয়েছে বৈঠক, সরকারের পক্ষ থেকে এসেছে ‘নীতিগত সম্মতি’র খবর। কিন্তু কর্মী পাঠানোর পালা আসতেই দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র—কতজন যাবে, কবে যাবে, কোন খাতে যাবে; কোনো প্রশ্নেরই এখনো নিশ্চিত উত্তর নেই।

এর মধ্যে দুই লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশে আশার সঞ্চার করা হলেও তা নাকচ করেছে মালয়েশিয়া সরকার।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এই শ্রমবাজার ঘিরে অবশ্য সরকারের তৎপরতা কমেনি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। দুই দেশের মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠক হয়। সর্বোচ্চ পর্যায়েও আলোচনা গড়ায়।

গত জুনে মালয়েশিয়া সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশটির প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন। একই সফরে মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গেও আলোচনা হয়।

ওই সফরের পর দ্রুত বাজার খোলার প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়। কয়েকদিন আগে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া।

সরকারের বিশেষ অনুরোধে প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে ‘জিরো কস্টে’ নেওয়ার বিষয়েও সম্মতি পাওয়া গেছে। বিমানভাড়াসহ অভিবাসন-সংক্রান্ত ব্যয় ছাড়াই তাদের পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে প্রথম দল পাঠানোর উদ্যোগের কথাও জানানো হয়।

কিন্তু এর পরপরই সামনে আসে নতুন তথ্য। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার শুহাদা ওথমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের জানান, আগামী ছয় মাসে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেবে মালয়েশিয়া। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পর্যায়ক্রমে কর্মী পাঠানো শুরু হবে এবং ছয় মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যে যখন কর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়, তখনই মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে আসে উল্টো বার্তা।

দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিল

দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিল বলেন, আগামী ছয় মাসে দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যকে দেশটির সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী দাতুক সেরি আর. রামানানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি এ তথ্য পেয়েছেন বলে জানান।

দুই দেশের এমন বিপরীতমুখী বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—শ্রমবাজার আসলে কোন পর্যায়ে রয়েছে? দুই লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা যদি মালয়েশিয়ার সিদ্ধান্ত না হয়, তাহলে বাংলাদেশে সেই তথ্য এলো কীভাবে?

আবার ১০ হাজার কর্মীকে জিরো কস্টে নেওয়ার যে পরিকল্পনার কথা বাংলাদেশ জানিয়েছে, সেটিই বা কবে বাস্তবায়িত হবে?

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে, তবে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চূড়ান্ত হয়নি। সুনির্দিষ্ট কোটা কত হবে, কোন কোন খাতে কর্মী নেওয়া হবে, নিয়োগের সময়সূচি কী হবে—এসব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। এমনকি প্রথম কর্মী বহর কবে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হবে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট ঘোষণা নেই।

অর্থাৎ রাজনৈতিক পর্যায়ে ইতিবাচক আলোচনা হলেও কর্মী পাঠানোর বাস্তব প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি।

এর আগে মালয়েশিয়া ২০২৪ সালের ১লা জুন থেকে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নতুন কর্মী নিয়োগে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর আগে ভিসা বা কোটা অনুমোদন পাওয়া সত্ত্বেও প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশটিতে ঢুকতে পারেননি। এরপর নতুন নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

এর আগে বিপুল অর্থ খরচ করে মালয়েশিয়ায় গিয়ে অনেক কর্মী প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়ার অভিযোগও করেন। কেউ ঋণ করে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পেয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন। এসব অভিজ্ঞতার কারণে এবার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আগের মতো অনিয়মের সুযোগ রাখতে চায় না মালয়েশিয়া।

দেশটির মানবসম্পদমন্ত্রী এরই মধ্যে স্থানীয় কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। বিদেশি কর্মী নেওয়ার আগে মালয়েশিয়ানদের চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করার নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির মোট শ্রমশক্তির তুলনায় বিদেশি কর্মীর হার প্রায় ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

ফলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রেও মালয়েশিয়াকে নিজেদের শ্রমবাজারের চাহিদা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

ইতোমধ্যে ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি অনুমোদন দিয়েছে মালয়েশিয়া। আরও ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও এই কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। সব মিলিয়ে ৩৩৮টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

তবে সমঝোতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কী ধরনের কাঠামোয় কর্মী পাঠানো হবে, নতুন সমঝোতায় বাংলাদেশের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত হবে এবং কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কতটা কমানো যাবে—এসব প্রশ্নের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মালয়েশিয়া এবার আগের নিয়োগব্যবস্থায় ফিরতে চাইছে না। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা, কম খরচ এবং সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে দেশটি। নিয়োগদাতার মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় বহনের মডেল নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এদিকে শ্রমবাজার খোলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের অনেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। কিন্তু সরকারই এখন তাদের সতর্ক করছে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের লেনদেন করা যাবে না। এমনকি মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা দিতেও নিষেধ করা হয়েছে।

সরকারের এই সতর্কবার্তার পেছনে রয়েছে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে প্রতারণার আশঙ্কা। অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে ঘিরে বিপুল অর্থ লেনদেন এবং প্রতারণার অভিযোগ থাকায় এবার আগেভাগেই কর্মীদের সতর্ক করা হচ্ছে।

ফলে কর্মীদের সামনে তৈরি হয়েছে এক ধরনের দ্বৈত পরিস্থিতি। একদিকে সরকার বলছে মালয়েশিয়া কর্মী নিতে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে, অন্যদিকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।

একজন বাংলাদেশি প্রতিমন্ত্রী দুই লাখ কর্মী নেওয়ার সময়সূচিও জানাচ্ছেন, আবার মালয়েশিয়া সরকার বলছে এমন কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি।

Visited 9 times, 1 visit(s) today