ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে “সংকট প্রস্তুতি” জোরদার করার প্রবণতা বাড়ছে
❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক সময়ে নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জমা রাখা তাদের সোনার একটি বড় অংশ সরিয়ে নিয়েছে। তবে সম্পূর্ণভাবে সব সোনা বা সম্পদ নিউ ইয়র্ক থেকে প্রত্যাহার করা হয়নি—বরং এটি একটি আংশিক ও কৌশলগত স্থানান্তর, যা ইউরোপজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কী ঘটেছে
২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংক অব ফ্রান্স নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে জমা থাকা তাদের পুরো সোনার মজুদ—প্রায় ১২৯ মেট্রিক টন, যা দেশটির মোট সোনার রিজার্ভের প্রায় ৫ শতাংশ—সরিয়ে ফেলে।
এক্ষেত্রে তারা “বিক্রি করে পুনরায় কেনা” পদ্ধতি অনুসরণ করে: নিউ ইয়র্কে থাকা পুরনো মানের বার বিক্রি করে দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের নতুন বার প্যারিসে কিনে নেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় ফ্রান্স প্রায় ১১০০ কোটি ইউরো মুনাফাও করেছে।
তৎকালীন গভর্নর ফ্রঁসোয়া ভিলেরোয়া দ্য গালো বলেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নয়।
২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিউ ইয়র্ক (ডিএনবি) ও কানাডার অটোয়া থেকে মোট প্রায় ৮৬ মেট্রিক টন সোনা সরিয়ে লন্ডনে নিয়ে যায়—যা উত্তর আমেরিকায় থাকা তাদের মোট মজুদের চার ভাগের এক ভাগেরও বেশি। এর মধ্যে প্রায় ৫৯ টন সোনা নিউ ইয়র্কে বিক্রি করে লন্ডনে নতুন করে কেনা হয়, আবার ২৭ টন সরাসরি সরিয়ে আনা হয় নেদারল্যান্ডসের জেইস্ট ভল্টে।
স্থানান্তরের পর ডিএনবির সোনার মজুদ এখন এভাবে বিভক্ত: লন্ডনে ৩২.১%, জেইস্টে ৩০.৮%, এবং নিউ ইয়র্ক ও অটোয়া মিলিয়ে ১৮.৫%। অর্থাৎ নেদারল্যান্ডস এখনও নিউ ইয়র্কে কিছু সোনা রেখে দিয়েছে—পুরোপুরি সরিয়ে নেয়নি।
কারণ কী
- ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: ডিএনবি সরাসরি বলেছে, ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে তারা তাদের “সংকট প্রস্তুতি” বাড়াতে চাইছে।
- দ্রুত ব্যবহারযোগ্যতা: ডিএনবির যুক্তি হলো, তীব্র সংকটকালে নিউ ইয়র্ক বা অটোয়ায় রাখা সোনা দ্রুত ও সরাসরি ব্যবহার করা কঠিন হতে পারে, তাই ভৌগোলিকভাবে আরও ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন প্রয়োজন।
- যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরতা কমানো: ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অননুমেয়তা নিয়ে ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। জার্মানিতে বিরোধী দল এএফডি জার্মানির সব বিদেশি সোনা ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছে, যদিও বুন্দেসব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জোয়াকিম নাগেল এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
- ডলার-নির্ভরতা ও ঝুঁকি হ্রাস: রাশিয়ার বৈদেশিক রিজার্ভ জব্দ হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার-নির্ভর সম্পদ থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখাচ্ছে, এবং সোনা কেনা বহু দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
- অর্থনৈতিক সুবিধা: ফ্রান্সের ক্ষেত্রে “বিক্রি করে পুনরায় কেনা” কৌশল থেকে সরাসরি আর্থিক মুনাফাও একটি বাড়তি কারণ ছিল।
কী প্রভাব পড়তে পারে
- বাজারে সংকেত: এই পদক্ষেপগুলো অন্যান্য ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য একটি সংকেত তৈরি করেছে—অনেকে ভাবছেন জার্মানি বা অন্য দেশও একই পথে হাঁটবে কিনা।
- সোনার দামে প্রভাব: সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা ও পুনর্বণ্টনের প্রবণতা সোনার দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে; সম্প্রতি সোনার দাম আউন্সপ্রতি প্রায় ৪,৩৮৩ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালের শেষ দিনের তুলনায় অনেক বেশি।
- যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের ইঙ্গিত: যদিও উভয় দেশ বলেছে সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক নয়, বিশ্লেষকরা এটিকে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কে আস্থার ঘাটতির একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
- যুক্তরাষ্ট্রের সুনামের ওপর প্রভাব: নিউ ইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ সোনা সংরক্ষণাগারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই ধরনের প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে, যদিও উভয় পক্ষই জোর দিয়ে বলেছে কোনো তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা হুমকি নেই।
- সম্পূর্ণ প্রত্যাহার নয়: উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নেদারল্যান্ডস এখনও নিউ ইয়র্কে কিছু সোনা রেখে দিয়েছে, এবং জার্মানির মতো দেশ এখনও তাদের বড় অংশের রিজার্ভ যুক্তরাষ্ট্রে বজায় রেখেছে—অর্থাৎ এটি একটি পূর্ণাঙ্গ “ডি-ডলারাইজেশন” বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া নয়, বরং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি পদক্ষেপ।
