ড. মামুনুর রশীদ
এপ্রিল ২০২৬ সালে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রথম আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছিলো প্রায় ৪৫,০০০ কোটি টাকার নতুন অনেকগুলো বিমান ক্রয়। অতিসম্প্রতি এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের একটা বিল বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।
এখানে বলে রাখা ভালো, এর একটা বড় অংশ আসবে ঋণ থেকে। এবং প্রথম বিমান হাতে পেতে লাগবে পাঁচ বছর সময়। তার মানে অংকটা ৭ বিলিয়ন ডলারের চাইতে অনেক বেশি। বিএনপি সরকারের যে অবস্থা, তাতে পরবর্তী সরকারকে এই বড় অঙ্কের সাদা হস্তির সামাল দিতে ভিক্ষা করতে হবে আরও ৫০ বছর।
এই বড় বিনিয়োগের পিছনে অনেক কথা উঠছে। তবে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো নতুন বিমান ক্রয় করে বাংলাদেশকে একটা বিমান হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
আসুন একটু বিশ্লেষণ করি কেন সেটা সম্ভব নয়। বরং শেখ হাসিনার সময়ে শুরু হওয়া স্থলভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাই বাংলাদেশের জন্য উত্তম।
ঢাকাকে আঞ্চলিক বিমান হাবে পরিণত করার প্রস্তাব তিনটি পরিমাপযোগ্য কারণে টেকে না:
১) দুই ঘণ্টার উড়াল দূরত্বে যাত্রীপ্রবাহের এলাকা অত্যন্ত সংকীর্ণ,
২) স্থানীয় পর্যটন ও বাণিজ্যের ভিত্তি অনুপস্থিত, এবং
৩) জ্বালানি ব্যবস্থা সরবরাহ শৃঙ্খলিত নয়।
সফল প্রতিটি হাবে তিনটি উপাদান একসঙ্গে থাকে:
১) বড় ও নিজস্ব যাত্রীপ্রবাহের এলাকা,
২) ঘন অভ্যন্তরীণ বাজার, এবং
৩) সস্তা ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি।
বাংলাদেশের একটিও নেই। বরং দেশটির তুলনামূলক সুবিধা জল এবং স্থলপথের লজিস্টিকে, যেখানে ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের বিপক্ষে নয়, পক্ষে কাজ করে।

(১) যাত্রীপ্রবাহের এলাকা অত্যন্ত সংকীর্ণ
হাবের অর্থনীতি নির্ভর করে প্রায় দুই ঘণ্টার উড়াল, অর্থাৎ প্রায় ১,৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে সংযোগকারী যাত্রীপ্রবাহের ওপর। এই পরিসরে ঢাকার নাগালে আছে মাত্র ছয়টি বিদেশি বাজার: ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, লাওস এবং দক্ষিণ পশ্চিম চীন।
দুবাইয়ের নাগালে নয়টি, ইস্তানবুলের সতেরোটি।
আরও বড় সমস্যা হলো, ঢাকার এই এলাকার জনসংখ্যা ও আয়ের সিংহভাগ ভারতের। আর ভারত দিল্লি ও নাবি মুম্বাইয়ে নিজের হাব গড়ছে। এটা কোনো সরবরাহকারী বাজার নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী। ব্যবধানটি সংখ্যাতেও স্পষ্ট।
২০২৫ সালে দুবাই ৯৫.২ মিলিয়ন এবং ইস্তানবুল ৮৪.৪ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহন করেছে, যেখানে হযরত শাহজালালে সংখ্যাটি প্রায় ১২.৭ মিলিয়ন। এমিরেটস ও টার্কিশ এয়ারলাইনস কয়েকশ উড়োজাহাজ নিয়ে ওই হাবগুলোর মূল চালিকাশক্তি।
বিমান চালায় ঊনিশটি উড়োজাহাজ, গন্তব্য ত্রিশটি, এবং একটিও পণ্যবাহী উড়োজাহাজ নেই। মূল বাহক ছাড়া যা থাকে তা হাব নয়, নিছক একটি টার্মিনাল।
(২) পর্যটন বা বাণিজ্যের ভিত্তি নেই
২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৬,৫০,০০০ বিদেশি এসেছেন, যাঁদের মধ্যে অবকাশে এসেছেন মাত্র ২৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ জন। একই বছরে মালদ্বীপে গেছেন ১.৮ মিলিয়ন এবং শ্রীলঙ্কায় ১.৫ মিলিয়ন পর্যটক।
পর্যটনের জন্য বর্তমানের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে কেউ বাংলাদেশে আসবে কি? অন্যদিকে সেন্ট মার্টিনস দীপ এবং পাহাড়ি অঞ্চলের উপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে কিনা তাও পরিষ্কার নয়।
পণ্যের দিকেও ট্রান্সশিপমেন্ট ধরা সম্ভব নয়, কারণ বড় জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা নেই। চট্টগ্রাম সর্বোচ্চ ২,৮০০ টিইইউর জাহাজ নিতে পারে এবং কলম্বো ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা ফিডার জাহাজের ওপর নির্ভরশীল।
২০২৪ সালে একা কলম্বো ৭.৭৮ মিলিয়ন কনটেইনার সামলেছে, আর চট্টগ্রাম ৩.৩০ মিলিয়ন, বিশ্বে যার অবস্থান ৬৭তম।
আকাশপথের পণ্য পরিবহনেও প্রতিযোগিতা করার অবস্থা নেই: ঢাকায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খরচ কেজিপ্রতি প্রায় ২৯ সেন্ট, দিল্লিতে ৫ সেন্ট। এ কারণেই রপ্তানিকারকেরা ভারতীয় বিমানবন্দর দিয়ে ৩৪,৯০০ টন পোশাক পাঠিয়েছিলেন, যার মূল্য ৪৬২ মিলিয়ন ডলার, আর ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারত সেই সুবিধা প্রত্যাহার করে।
(৩) ভেঙে দেয়া জ্বালানি নিরাপত্তা হাবের কার্যক্রম টানতে পারবে না
হাব চলে নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং বিপুল জ্বালানি খরচ করে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার ছিল ৫৯৭ কিলোওয়াট ঘণ্টা, যেখানে মালয়েশিয়ায় ৫,০৮৫, সিঙ্গাপুরে ১০,১৩৬, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪,৬২২ এবং কাতারে ১৭,৫৩০। ২০২৬ সালের অগাস্টে জাতীয় ঘাটতি গড়ে প্রায় ৩,০০০ মেগাওয়াট ছিল, এবং ঢাকার বাইরে দৈনিক ৩ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। এমন ব্যবস্থার ওপর ভরসা করে কোনো এয়ারলাইন প্রশস্ত দেহের উড়োজাহাজ বা পচনশীল পণ্যের পরিবহন সাজাবে না।
আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বিমান হাবের একটা উদ্দেশ্য দিল্লির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের যোগাযোগের ভিত্তি কি হতে পারে:
বাংলাদেশের উচিত বিমান হাবের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছেড়ে (জল এবং) স্থলভিত্তিক বহুমাধ্যম লজিস্টিক করিডোরে বিনিয়োগ করা। ভারত তিন দিক থেকে দেশটিকে ঘিরে রেখেছে, আর বেনাপোল ও পেট্রাপোল ইতিমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম স্থলবন্দর, যা দুই দেশের স্থলবাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ বহন করে।
সীমান্ত অবকাঠামো, শুল্ক প্রক্রিয়াকরণ এবং উত্তর পূর্ব ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সড়ক ও রেল সংযোগ উন্নত করলে মূলধন ব্যয়ের সামান্য অংশেই প্রতিদান মিলবে, এবং ভূগোলের বিরুদ্ধে না লড়ে তাকে কাজে লাগানো যাবে।
