ফ্যামিলি কার্ড: ৪১ লাখ কার্ড বানাতেই খরচ ২৪৬ কোটি টাকা!

ফ্যামিলি কার্ড: ৪১ লাখ কার্ড বানাতেই খরচ ২৪৬ কোটি টাকা!
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


ফ্যামিলি কার্ডের সূচনালগ্নে ৪১ লাখ পরিবারের জন্য ‘টাকাপে’ প্লাস্টিক কার্ড প্রস্তুত করতেই প্রায় ২৪৬ কোটি টাকা খরচ হতে যাচ্ছে, যেখানে একেকটি কার্ডের উৎপাদন খরচ ধার্য করা হয়েছে ৬০০ টাকা।

তবে এই বিশাল খরচের অর্থ কোন উৎস থেকে আসবে—তা সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হবে নাকি কোনো উপায়ে গ্রহীতাদের ওপর চাপানো হবে, সে সংক্রান্ত কোনো অন্তিম সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খুব দ্রুতই এই জটিলতার অবসান ঘটবে।

কেবল কার্ড উৎপাদনের প্রাথমিক খরচেই বিষয়টির ইতি টানছে না; উপরন্তু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল রাখা, অর্থ লেনদেন করা এবং এমএফএস ব্যবহারের অতিরিক্ত ফি ও সার্ভিস চার্জ যুক্ত হচ্ছে।

এর ফলে ৪১ লাখ পরিবারকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা প্রদানের নির্ধারিত অংকের পাশাপাশি সামগ্রিক ডিজিটাল বিতরণ কাঠামোর পেছনে সরকারের সর্বমোট ঠিক কত ব্যয় হবে, তা নিয়ে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে টাকা পৌঁছানোর কাজে টাকাপে নেটওয়ার্ক ব্যবহার এবং এর সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসগুলোকে (এমএফএস) যুক্ত করার বিষয়ে সচিবালয়ে মঙ্গলবার একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অর্থ বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত থাকলেও, কার্ড তৈরির ব্যয়ের ভার কে বহন করবে—সে প্রশ্নে কোনো সমাধান মেলেনি।

অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্যক্ত করেন, প্রতি কার্ডে বরাদ্দকৃত ৬০০ টাকা সরকার বহন করবে নাকি ভিন্ন কোনো উৎস সন্ধান করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা হয়নি। বিভিন্ন পক্ষের সুচিন্তিত মতামত আহ্বান করা হয়েছে এবং পরবর্তী সভায় এ ব্যাপারে রূপরেখা নির্ধারিত হবে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাথমিক ধাপে ৪১ লাখ পরিবারকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা জোগাবে সরকার। বাজেটে ইতিমধ্যেই এই মহতী পরিকল্পনার জন্য আনুমানিক ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এমতাবস্থায় কার্ড তৈরির অতিরিক্ত ২৪৬ কোটি টাকার খরচের বাধ্যবাধকতা সামনে এলো, যার সাথে আনুসঙ্গিক প্রশাসনিক ও রূপান্তর খরচ যোগ হলে বাজেটের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।

অর্থ বিভাগের অপর এক কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা প্রদান করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। তাই কার্ড পাওয়ার অজুহাতে সুবিধাভোগীদের কাঁধে কোনো নতুন ফি চাপানো হবে কি না, তা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। একইসঙ্গে রাজকোষের অর্থের অপচয় রোধ ও সঠিক ব্যবহারের বিষয়টিও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

এর আগে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছিলেন যে, ফ্যামিলি কার্ড সেবাটি পুরোপুরি বিনামূল্যে প্রদান করা হচ্ছে এবং এই কার্ডের নামে কোনো প্রকার অর্থ দাবির সুযোগ নেই।

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে টাকা চাওয়া হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, আসন্ন বৈঠকেই সব ধোঁয়াশা কেটে যাবে।

সূত্র মতে, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহীতাদের ব্যাংক হিসাবের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। উক্ত ব্যাংকগুলোর ব্যাতিরেকে টাকাপে কার্ড কাজে লাগিয়ে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে গ্রাহকরা ভাতা তুলতে সক্ষম হবেন।

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ এটিকে সরকারের শীর্ষ অগ্রাধিকার আখ্যা দিয়ে আশ্বাস দেন যে অর্থের যোগানে কোনো সংকট হবে না এবং চাহিদা অনুসারেই বাজেট ছাড় করা হবে।

তিনি আরও যোগ করেন, এটি শুধু সামাজিক সুরক্ষাই জোগাবে না, বরং নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনার মানবিক প্রয়াস হিসেবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। মন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর ২৪৬ কোটি টাকার অতিরিক্ত খরচের প্রশ্নটি ভিন্ন গুরুত্ব পাচ্ছে।

টাকাপের মাধ্যমে টাকা যাবে

ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পরিশোধে টাকাপে ব্যবহারের পেছনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো একটি সুরক্ষিত ও নজরদারিকৃত ডিজিটাল অর্থ আদান-প্রদান অবকাঠামো গড়ে তোলা।

সংশোধিত মিটিং নোটিশে ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সাথে টাকাপের ডিজিটাল সমন্বয়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই কাঠামোয় ক্যাশ টাকা সরাসরি হাতে দেওয়ার বদলে নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমেই টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে।

এই ব্যবস্থার কারণে মধ্যস্বত্বভোগীদের অবৈধ সুযোগ নেওয়ার পথ বন্ধ হবে এবং রাষ্ট্রের টাকা শতভাগ সরাসরি প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে। আগামী চার বছরে সর্বমোট ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড সুবিধার আওতায় আনার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের।

প্রতি কার্ডে ৬০০ টাকা ব্যয় হিসাব করা হলে কেবল এই ১ কোটি ৬০ লাখ প্লাস্টিক কার্ড ছাপাতেই রাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা।


যুগান্তর
Visited 4 times, 1 visit(s) today