প্রশাসনের নাকের ডগায় সিলগালা করা ৯ লাখ ঘনফুট বালু গায়েব! পাচারে জড়িত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা

প্রশাসনের নাকের ডগায় সিলগালা করা ৯ লাখ ঘনফুট বালু গায়েব! পাচারে জড়িত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা
শেয়ার করুন

❐ স্থানীয় সংবাদদাতা


কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে জব্দ ও সিলগালা করে রাখা প্রায় ৯ লাখ ঘনফুট বালু নিলাম ছাড়াই রাতের আঁধারে সরিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি অনুসারে, গত ২৫শে আগস্ট, মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু করে ২৭শে আগস্ট, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কালিরকুড়া টি-বাঁধ থেকে ফকিরের হাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা থেকে ডাম্প ট্রাকে করে এই বিপুল পরিমাণ বালু পাচার করা হয়।

এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, বালু সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে তাত্ক্ষণিকভাবে অবহিত করার পর পাচার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কালিরকুড়া টি-বাঁধ এলাকায় আগের দুটি বালু মহালে নতুন করে আরও ১১টি অবৈধ পয়েন্ট চালু করা হয়। এসব পয়েন্ট মূলত ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে একদল প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জব্দকৃত বালু সহজে পরিবহনের স্বার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাঁধের অংশ কেটে ফেলা হয়েছে এবং নিরাপত্তা ব্লকের সিসি পিচিং তুলে অন্তত সাতটি স্থানে চলাচলের রাস্তা বানানো হয়েছে। এতে পুরো বাঁধের স্থায়ী নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

এর আগে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১২ই মে চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে সেখানে এক বিশেষ অভিযান চালানো হয়। সেই অভিযানে সংশ্লিষ্ট ১৩টি পয়েন্ট থেকে মোট ৯ লাখ ঘনফুট বালু জব্দ করে প্রশাসনিকভাবে সিলগালা করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে ৩০শে মে স্থানীয় বাসিন্দারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ টি-বাঁধ সুরক্ষার দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। ঐ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা বাঁধ কেটে তৈরি করা বালু পরিবহনের কয়েকটি বিকল্প রাস্তা নিজ উদ্যোগে ভেঙে দেন।

প্রাশাসনিক প্রক্রিয়ায় জব্দ করা বিশাল এই বালুর স্তূপ পাহারা ও সংরক্ষণের স্বার্থে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আসলাম হক এবং মুকুল মণ্ডলকে আনুষ্ঠানিকভাবে জিম্মাদার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একাধিক সূত্রের দাবি, ইউপি সদস্য আসলাম হক নিজেও পর্দার আড়ালে এই অবৈধ বালু ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাকে জিম্মাদার নিয়োগের সময় স্থানীয় সচেতন মহলের পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি জানানো হলেও তা বিবেচনা করা হয়নি।

এলাকাবাসীর ধারণা, জিম্মাদার ইউপি সদস্যের প্রত্যক্ষ পরামর্শ ও মদতেই ব্যবসায়ীরা রাতারাতি সিলগালা করা বালু সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য মো. আসলাম হক বলেন, ‘বালু সরানোর এই ঘটনার সাথে আমার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যাচার করছে। বিষয়টি আমি ইতোমধ্যে ইউএনও মহোদয়কে অবহিত করেছি এবং তিনি পাচারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

অন্যদিকে অপর জিম্মাদার মুকুল মণ্ডল ক্ষোভের সাথে জানান, ‘বালু চুরির বিষয়টি জানামাত্রই আমি ইউএনও মহোদয়কে জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি জড়িতদের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো আমাকেই চলন্ত বালুবাহী গাড়ি আটকে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।’

পুরো বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুল হাসান জানান, ‘জব্দ তালিকাভুক্ত বালু চুরির ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে খুব দ্রুতই দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Visited 4 times, 1 visit(s) today