রাশিয়া-মিয়ানমার সম্পর্ক: নিরাপত্তা থেকে অর্থনৈতিক জোটের দিকে

রাশিয়া-মিয়ানমার সম্পর্ক: নিরাপত্তা থেকে অর্থনৈতিক জোটের দিকে
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং গত ১৭-১৯ আগস্ট মস্কো সফর করেছেন এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই সফরকে রাশিয়া-মিয়ানমার সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে দুই দেশের বন্ধুত্ব সামরিক সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে ক্রমেই বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের দিকে এগোচ্ছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর পশ্চিমা চাপ সত্ত্বেও মস্কো নেপিদোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক-প্রযুক্তিগত সম্পর্ক অটুট রেখেছিল। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ পাঁচ বছর মেয়াদি সামরিক সহযোগিতা চুক্তি সইও করে। তবে বর্তমান সম্পর্কে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, আর্থিক লেনদেন, পর্যটন, কৃষি ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

পুতিন-হ্লাইং বৈঠক ও বাণিজ্যের নতুন ভিত্তি

ক্রেমলিনে ১৮ আগস্টের বৈঠকে পুতিন জানান, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এখন রুশ রুবলে সম্পন্ন হচ্ছে। রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নমন্ত্রী মাক্সিম রেশেৎনিকভ জানান, সরাসরি করেসপন্ডেন্ট ব্যাংক হিসাব ইতিমধ্যে চালু আছে এবং গত মাসেই ভারতীয় রুপি সংশ্লিষ্ট একটি নতুন পেমেন্ট চ্যানেল চালু হয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার মির পেমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে মিয়ানমারের এমপিইউ নেটওয়ার্ক যুক্ত করে সরাসরি কিয়াত-রুবল লেনদেনও চালুর কথা জানিয়েছেন হ্লাইং।

মোট ১২টি আন্তঃসরকার নথি সই হয়েছে এই সফরে—যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, তেল-গ্যাস, ইলেকট্রনিক্স ও ডিজিটাল প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, সংস্কৃতি, স্যাটেলাইট নেভিগেশন, মহাকাশযাত্রা, উদ্ধার-ব্যবস্থা, প্রতিযোগিতা নীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তি।

দাউই বন্দর: বাণিজ্যের ভূগোল বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা

মিয়ানমারের আন্দামান সাগর উপকূলে অবস্থিত প্রায় ১৯৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দাউই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এই সম্পর্কের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। তানিনথারি অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই বন্দর ব্যবহার করলে জাহাজগুলো মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে চার থেকে ছয় দিন সময় বাঁচাতে পারবে। এখানে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র (৬৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত) এবং তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে রুশ কোম্পানিগুলো অংশ নিতে আগ্রহী।

জ্বালানি, পারমাণবিক প্রকল্প ও সার

২০২৪ সালে মিয়ানমারের বাজারে ব্যবহৃত তেলের ৯০ শতাংশেরও বেশি রাশিয়া থেকে এসেছে। পুতিন জানিয়েছেন, মিয়ানমারের অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানেও রাশিয়া সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এছাড়া ১১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ছোট মডুলার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিও হয়েছে, যা ২০২৭ সালে শুরু হতে পারে বলে রোসাটম জানিয়েছে।

সারের ক্ষেত্রে রাশিয়া থেকে মিয়ানমারে সরবরাহ ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এগারো গুণ বেড়েছে। মিয়ানমার তার চাহিদার ৯৫ শতাংশ রাসায়নিক সার আমদানি করে, আর দেশটি একইসঙ্গে একটি বড় চাল রপ্তানিকারক দেশ।

বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ও চ্যালেঞ্জ

২০২৪ সালে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল। এবারের সফরে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার জন্য বার্ষিক প্রায় ৩০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। মিয়ানমারের রপ্তানি এখনও মূলত পোশাক, বস্ত্র ও জুতায় সীমাবদ্ধ; তবে চাল, ডাল, ভুট্টা, তিল ও মৎস্যপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন হ্লাইং।

নিষেধাজ্ঞা প্রতিরোধ ও কৌশলগত তাৎপর্য

দুই দেশ একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে একতরফা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলার অঙ্গীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পর্ক এখন নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক জোট থেকে একটি নিষেধাজ্ঞা-প্রতিরোধী, ডলার-নির্ভরতা কমানো অর্থনৈতিক করিডোরে রূপ নিচ্ছে, যা রাশিয়ার সুদূরপ্রাচ্যকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। তবে বিশ্লেষকরা এটাও বলছেন, বাস্তব ফলাফল নির্ভর করবে প্রকল্পগুলোর প্রকৃত বাস্তবায়নের ওপর—নইলে এই সম্পর্ক রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে সীমিতই থেকে যাবে।

সূত্র: Russia’s Pivot to Asia

Visited 6 times, 1 visit(s) today