উদ্ধার আইইডিতে একই উপকরণ, ব্যাগে বহন: তথ্য-প্রযুক্তিগত কৌশলে দেশজুড়ে সক্রিয় জঙ্গি নেটওয়ার্ক

উদ্ধার আইইডিতে একই উপকরণ, ব্যাগে বহন: তথ্য-প্রযুক্তিগত কৌশলে দেশজুড়ে সক্রিয় জঙ্গি নেটওয়ার্ক
শেয়ার করুন

❐ আয়নাল কারিগর


সাভারে পরপর বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির একটি সক্রিয় চক্রের বিষয়ে নতুন তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটির সদস্যরা প্রচলিত যোগাযোগমাধ্যম এড়িয়ে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের জন্য অপ্রচলিত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতেন। অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রেও তারা ব্যবহার করতেন আলাদা একটি অ্যাপ।

তদন্তকারীদের ধারণা, প্রযুক্তিনির্ভর এই যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমেই সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সমন্বয় করা হতো।

পড়ুন: হোটেল অলিও অভিযানে আটক- ইউনূস আমলে খালাস, জেএমবির ‘বোমারু মামুন’ এখন পুলিশের খাতায় ‘নাটের গুরু’

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে মোহাম্মদ আরিফ নব্য জেএমবির সদস্যদের যোগাযোগের একটি পদ্ধতি সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘প্রটেকটেড টেক্সট’ বা ‘পিটি’ নামে একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সদস্যরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতেন। আর্থিক লেনদেনের জন্য ব্যবহার করা হতো ‘এলিমেন্ট’ নামের একটি অ্যাপ।

মতিঝিলের ‘ছাতা বোমা’র পর এবার আশুলিয়ায় দোকানে রেখে গেল ‘প্রেশার কুকার বোমা’

প্রেশার কুকার বোমা

তদন্তকারীরা এখন এসব ডিজিটাল যোগাযোগের সূত্র ধরে চক্রটির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক শনাক্তের চেষ্টা করছেন।

পড়ুন: ভারত-মার্কিন গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যেই সাভারে জেএমবি সদস্য বোমা ও সরঞ্জামসহ আটক

সিটিটিসি সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সন্দেহভাজন নব্য জেএমবি সদস্যদের চলাফেরায়ও কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। তাদের অনেকেই পিঠে ব্যাগ নিয়ে চলাফেরা করতেন।

তদন্তকারীদের ধারণা, এসব ব্যাগে অস্ত্র, ছুরি, চাপাতি ও বিস্ফোরক বহন করা হতো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশির মুখে পড়লে অস্ত্র বা বিস্ফোরক ব্যবহার করে হামলা চালিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার কৌশলও তারা অনুসরণ করতেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

বোমায় ব্যবহৃত হচ্ছে বল-বিয়ারিং, যা বিস্ফোরিত হলে মানুষের শরীর ছিন্নভিন্ন করে দিতে সক্ষম

গত মঙ্গলবার দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকা থেকে মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার সঙ্গে থাকা ব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে পাঁচটি বোমা এবং ছুরিসদৃশ আরও তিনটি বোমা উদ্ধার করা হয়।

পড়ুন: আবারও সাভারে প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচটি বোমাই জিআই পাইপের ভেতরে তৈরি করা হয়েছিল। এ সময় বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়।

আরিফকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকার একটি তিনতলা বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখানে ১১টি পাইপবোমা বা আইইডি এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করে পুলিশ।

মেট্রো স্টেশন থেকে উদ্ধার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাইপবোমার ছাতা খুললেই ঘটাত বিস্ফোরণ

মতিঝিলে উদ্ধার হয় পাইপ বোমা প্রযুক্তিতে তৈরি ছাতা বোমা

এ ঘটনায় সাভার থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। মামলায় আরিফসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।

পড়ুন: মাথাচাড়া দিচ্ছে জঙ্গিবাদ, ফিরে এলো বোমাতঙ্ক: এক সপ্তাহে উদ্ধার দুই আইইডিতে সেই পুরনো প্যাটার্ন

তদন্তকারীরা বলছেন, দক্ষিণ শ্যামপুরের ওই বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের মধ্যে কয়েকটি তাদের কাছে অপেক্ষাকৃত নতুন ধরনের বলে মনে হয়েছে। এসব বিস্ফোরকের প্রকৃতি, উপাদান ও সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে নিশ্চিত হতে রাসায়নিক পরীক্ষা চলছে।

পরীক্ষার ফল হাতে এলে এগুলো কীভাবে তৈরি বা ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর পেছনে কী ধরনের পরিকল্পনা ছিল, সে বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

এর পরদিন বুধবার, ১২ই আগস্ট, সাভারের সাধাপুর এলাকায় একটি মসজিদের মাঠে নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রামের ভেতর থেকে স্কচটেপে মোড়ানো আরেকটি বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকার সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি নিষ্ক্রিয় করে। এ ঘটনায়ও সাভার থানায় মামলা করা হয়েছে।

পড়ুন: মতিঝিলের ‘ছাতা বোমা’র পর এবার আশুলিয়ায় দোকানে রেখে গেল ‘প্রেশার কুকার বোমা’

সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানিয়েছেন, মোহাম্মদ আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তবে মামলাটি পরবর্তী সময়ে অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়েছে। আসামি এবং মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্রও ওই ইউনিটের কাছে দেওয়া হয়েছে।

তদন্তকারীদের নজরে এসেছে, শুধু সাভারেই নয়, সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি ঘটনায় উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক ও বোমার উপকরণেও কিছু মিল রয়েছে।

মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি ছাতার ভেতর থেকে উদ্ধার করা বোমা এবং আশুলিয়ার একটি মুদিদোকান থেকে উদ্ধার হওয়া ‘প্রেশার কুকার’ বোমার উপকরণ বিশ্লেষণ করে একই ধরনের বিস্ফোরকদ্রব্য, বিয়ারিং বল ও সার্কিট সুইচ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সূত্রগুলো আরও বলছে, এসব বোমায় ট্রাই-অ্যাসিটোন ট্রাইপার-অক্সাইড বা টিএটিপি নামের বিস্ফোরক ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তকারীদের মতে, এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিস্ফোরক হওয়ায় তাপ, ঘর্ষণ, আঘাত কিংবা নড়াচড়ার মতো ঘটনায়ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে উদ্ধার হওয়া বোমা ও বিস্ফোরকের রাসায়নিক প্রকৃতি নির্ধারণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

একাধিক ঘটনায় একই ধরনের বিস্ফোরক ও উপকরণ ব্যবহারের তথ্য পাওয়ায় ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখছেন না তদন্তকারীরা। তাদের ধারণা, এসব ঘটনার মধ্যে সাংগঠনিক যোগাযোগ বা পূর্বপরিকল্পিত কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে। সেই যোগসূত্র শনাক্তের পাশাপাশি বিস্ফোরকগুলোর উৎস, সরবরাহব্যবস্থা এবং এগুলো তৈরির সঙ্গে কারা জড়িত—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এরই মধ্যে গত ২১শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী এলাকায় তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাটিও নতুন করে তদন্তের আওতায় এসেছে।

পুলিশের ভাষ্য, ওই ঘটনায় জড়িত একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাকিব নামের এক যুবক হামলার সময় এক পুলিশ সদস্যকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি মাদরাসায় বিস্ফোরণের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও অন্তত ১০টি বোমা ও বিস্ফোরক-সংশ্লিষ্ট ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার কয়েকটিতে নব্য জেএমবির সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে বলে সিটিটিসির একটি সূত্র জানিয়েছে।

তদন্তকারীদের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার সঙ্গে পাঁচজনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হলেন—মামুন ওরফে ‘বোমারু’ মামুন, শেখ আল আমিন, মোহাম্মদ আরিফ, রাকিব ও বাপ্পী। তাদের মধ্যে শেখ আল আমিন ও মোহাম্মদ আরিফ ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্যদিকে রাকিব ও বাপ্পী এখনো পলাতক।

তদন্তকারীদের ধারণা, পলাতক মামুন ওরফে ‘বোমারু’ মামুনই চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে সাম্প্রতিক বোমা ও বিস্ফোরক-সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর পেছনের নেটওয়ার্ক, সদস্যদের পারস্পরিক যোগাযোগ, বিস্ফোরক সংগ্রহ ও সরবরাহের পথ এবং সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সাভারে ধারাবাহিকভাবে বোমা ও বিস্ফোরক উদ্ধারের পর এখন চক্রটির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরকের রাসায়নিক উপাদান ও ব্যবহৃত সরঞ্জামের মিল খতিয়ে দেখে ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো সাংগঠনিক যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।

বোমারু মামুন

বিস্ফোরকের উৎস থেকে শুরু করে এর সরবরাহ ও প্রস্তুতকারকদের শনাক্ত করা পর্যন্ত তদন্তের পরিধি এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে।

বাংলাদেশে পাইপবোমার ইতিহাসে জড়িয়ে আছে মুফতি হারুন ইজহার ও তার বাবার নাম

সারাদেশে আইএস জঙ্গিদের আদলে উগ্রবাদী পতাকা টাঙানোর ঘটনায় নেপথ্যের কুশীলবের নাম জানা গেছে ইতিমধ্যে। রাজধানীর নাজিমুদ্দিন রোডের শরিয়াহ গ্র্যাজুয়েশন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক হিসেবে কাজ করা ভয়ঙ্কর জঙ্গি এবং ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি হারুন ইজহার। আসুন তার ইতিহাস ও অতীত সম্পর্কে জানা যাক।

 

সময়কাল ৭ই অক্টোবর, ২০১৩। গণজাগরণ মঞ্চ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, হেফাজতের শাপলা চত্বর তাণ্ডব মিলে উত্তাল দেশ। এসময় চট্টগ্রামের লালখান বাজারস্থ জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ অন্তত ৮-৯ আহত হন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজন মারা যান। শুরুতে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কম্পিউটারের ‘ইউপিএস’ বিস্ফোরণের হাস্যকর দাবি তুলে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরে গোয়েন্দা সংস্থা এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের বিশেষজ্ঞরা সেখানে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস তথা আইইডি বা হাতে তৈরি বোমা উৎপাদনের হদিস পান। উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু অবিস্ফোরিত ‘পাইপবোমা’ এবং বোমা তৈরির যন্ত্রাংশ।

এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে পরে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হারকাতুল জিহাদের চার জঙ্গিকে ঢাকায় আটক করেছিল। তাদের মধ্যে ২০০৫ সালের ১৭ই আগস্টের সিরিজ বোমা হামলার এক পলাতক আসামী ছিলেন। অস্ত্র এবং বিস্ফোরকসহ দু’জনকে ঢাকার উত্তরা থেকে এবং অন্য দু’জনকে ধরা হয় আশুলিয়া থেকে। সেসময় আটক ৪ জনের কাছ থেকে এসএমজির ১,১০০ রাউন্ড গুলি, পিস্তলের ৩২টি গুলি এবং এক কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়।

আটক জেএমবির জঙ্গি আরিফ

হেফাজতে ইসলামের নিয়ন্ত্রণাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে বিস্ফোরণের পর উদ্ধারকৃত বোমাগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে ‘হাতে তৈরি গ্রেনেড’ উল্লেখ করেছিল পুলিশ। তখন এ ঘটনাকে মাদ্রাসা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের ষড়যন্ত্র দাবি করে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয় বিভিন্ন পক্ষ থেকে। তবে বোমা বিশেষজ্ঞরা পরে ‘পাইপবোমা’ শনাক্ত করেন।

২০১১ সালের জানুয়ারি মাসেও একই ধরনের ১১টি বোমা উদ্ধার করা হয়েছিল চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানা এলাকা থেকে। তখন বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানে এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সর্বাধিক নাশকতা চালানোর অভিযোগ আছে জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার বিরুদ্ধে।

সেসময়কার গোয়েন্দা তথ্য থেকে আরও উঠে আসে, লস্করের সাথে জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার পরিচালক- হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মুফতি ইজহারুল ইসলাম এবং তার ছেলে মুফতি হারুন ইজহারের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ২০১১ সালে গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি হারুন নিজে এই তথ্য দেন পুলিশকে। এর আগে ২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তার বাবা মুফতি ইজহারুল ইসলাম- যিনি উপমহাদেশের একজন শীর্ষ জঙ্গি নেতা হিসেবে কুখ্যাত।

হারুন ইজহার (ডানে), বিএনপির প্রতিমন্ত্রী টুকুর সাথে

জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার মধ্যে আইইডি তৈরির কারিগর হিসেবে যার নাম বেশি প্রচারিত তিনি হলেন ভারতের মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ডান হাত হিসেবে পরিচিত সৈয়দ আবদুল করিম ওরফে টুণ্ডা। লস্কর ও উগ্র জঙ্গিবাদের সমর্থক এই সন্ত্রাসী টুন্ডা ২০১৩ সালের আগস্টে নেপালে গ্রেপ্তার হন। টুণ্ডা গোপনে ভুয়া পরিচয়ে বাংলাদেশে এসেছিলে এবং জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন- এমন তথ্যও পেয়েছিল সেসময় দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সেসময় দায়িত্বরত গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং বোমা বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, লালখান বাজারের মাদ্রাসাটির ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমাগুলো পাইপবোমা প্রযুক্তির। যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এসব বোমা বিমানবন্দরের স্ক্যানার এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত কুকুরও শনাক্ত করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা এই প্রতিবেদককে জানান, এই বোমার উপকরণের সঙ্গে কফি মিশিয়ে রঙ এবং ঘ্রাণ পরিবর্তন করে জঙ্গিরা একে শনাক্তের অযোগ্য করে তোলে। মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে অসংখ্যবার এমন বোমা হামলার শিকার হয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এসব বোমা তাদের বেশ ভুগিয়েছে। পরে আফগানিস্তানে এ ধরনের বোমা নিষ্ক্রিয় করতে ‘ওয়াটার ব্লেড স্টিংরে’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমেরিকানরা।

সেসময় দায়িত্বরত দেশের একটি নিরাপত্তা সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাইপবোমা স্ক্যানারে ধরা পড়ে না। প্রশিক্ষিত কুকুরও গন্ধে বিভ্রান্ত হয় বলে তারাও ব্যর্থ হয়। দেশের বিভিন্ন হার্ডওয়্যার দোকানে এই বোমা তৈরির মূল সরঞ্জাম পাইপ ও সকেট (স্যানিটারি কাজে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়াম) পাওয়া যায়। অন্য উপকরণ যেমন- ইউরিয়া, নাইট্রিক এসিড, পটাশিয়াম ক্লোরাইড, নাইট্রোবেঞ্জিন, কার্বন টেট্রাক্লোরাইড এবং চিনির মতো সহজলভ্য জিনিস দিয়ে এই শক্তিশালী বোমা তৈরি করা সম্ভব। স্ক্যানার ও প্রশিক্ষিত কুকুর এই বোমার অবস্থান নির্ণয়ে ব্যর্থ হলে তা হবে ভয়ঙ্কর।

২০১৩ সালের সেই বিস্ফোরণের পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) তাদের প্রতিবেদনে লেখে: ‘বিস্ফোরণের পর মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে ৪টি অবিস্ফোরিত হ্যান্ড গ্রেনেডসদৃশ বোমা, ২৫০টি জিআই পাইপের টুকরো, ১০০টি মার্বেল, একটি তার প্যাঁচানো মোবাইল সেট, ২০০ গ্রাম জিআই তার, প্যাঁচানো স্প্রিং এবং দুটি স্লাইডরেঞ্জ উদ্ধার করা হয়েছে।’

পুলিশ প্রথমে উদ্ধারকৃত বোমাকে পুরনো ভার্সনের হাতে তৈরি গ্রেনেডসদৃশ বললেও হাতে তৈরি গ্রেনেডের সঙ্গে জিআই তার ও মোবাইল ফোন সংযুক্তির বিষয়টি আমলে নিয়ে বিশেষজ্ঞরা একে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে ব্যবহৃত পাইপবোমা হিসেবে শনাক্ত করতে সমর্থ হন।

তৎকালীন সিএমপির গোয়েন্দা শাখার উপপরিদর্শক ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্য সন্তোষ চাকমা ২০১১ সালে হাটহাজারী থেকে উদ্ধারকৃত বোমার সঙ্গে মুফতি হারুন ইজহারের মালিকানাধীন লালখান বাজারের মাদ্রাসার ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধারকৃত বোমার মিল থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন।

উগ্রবাদী পতাকা টাঙানোর নেপথ্যে জঙ্গি হারুন ইজহার

বোমা বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইইডি তৈরি করছে। মোটা লোহার পাইপের ভেতর বিস্ফোরক রেখে এই বোমা তৈরি হয়। বিস্ফোরণ ঘটাতে বোমার বাইরে রাখা হয় গ্রেনেডের মতো পিনের বিশেষ আংটা। এ ধরনের বোমাকে প্রেসার রিলিজ বোমাও বলা হয়। এই বোমার বাইরে থাকা বিশেষ আংটা ছুড়ে মারার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বাইরে শক্ত লোহার আবরণ থাকায় এর ধ্বংস ক্ষমতা বাড়ে। আর বোমার ভেতরে বিস্ফোরক ও ধারালো বস্তু থাকায় সেসব স্প্লিন্টার ছুটে গিয়ে মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক বোমা বিশেষজ্ঞ বলেন, এ ধরনের বোমায় ইনিশিয়েটরের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় ব্যাটারি। আবার ব্যাটারির পরিবর্তে সরাসরি মোবাইল ফোনও ব্যবহৃত হয়। বিস্ফোরককে অ্যাক্টিভেট করতে ব্যাটারি বা মোবাইল ফোন যুক্ত করা হয়। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে জঙ্গিরা হাতবোমা তৈরির জন্য এ রকম প্রযুক্তি ব্যবহার করে।

বাংলাদেশে জেএমবির কুখ্যাত জঙ্গি জাহেদুল ইসলাম ওরফে বোমারু মিজান প্রথম এই প্রযুক্তির বোমা তৈরি করেছিল বলে গোয়েন্দা তথ্য আছে। এরপর মাসুম নামের আরেক জেএমবি জঙ্গি বোমা তৈরিতে হাত পাকায়। হেফাজত নিয়ন্ত্রিত লালখান বাজারস্থ মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণে নিহত নূরুন্নবীও তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

আবদুল করিম টুণ্ডার প্রযুক্তিতে উদ্ভাবিত এই আইইডি প্রযুক্তির বোমা তৈরির ক্ষেত্রে ভারতে নব্বইয়ের দশকে বেশ কুখ্যাতি অর্জন করেন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল করিম। বোমা বানাতে গিয়ে বাঁ-হাতের খানিকটা উড়ে গেলে তিনি নামের পাশে টুণ্ডা বিশেষণ যোগ করেন। দিল্লি পুলিশের বরাতে জানা যায়, দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভারতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন টুণ্ডা। ৪৩টি বিস্ফোরণের ঘটনায় সরাসরি অভিযুক্ত টুণ্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আশির দশকে তিনি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কাছে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নেন।

এই টুণ্ডা বাংলাদেশে এসেও জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গেছেন। আর এসব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় গ্রেপ্তারের পর আটক মুফতি হারুনের দেওয়া তথ্যে। ২০১১ সালের ৫ই নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে স্বীকার করেন, লস্করের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে। ২০১৩ সালের বিস্ফোরণের পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দুই আর দুই-এ চার মেলান। লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে তাদের শেখানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চট্টগ্রামের সেই হেফাজতি মাদ্রাসায় বোমা তৈরি করা হচ্ছিল।

বিশ্ব গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশ ২০২৪-এর ৫ই আগস্টের পর আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের হাব হয়ে উঠেছে

লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকায় ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইজহারপুত্র মুফতি হারুনকে গ্রেপ্তার হন। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি হারুনের বিরুদ্ধে খোদ হেফাজতে্ ইসলামের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। তিনি দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার পিতা মুফতি ইজহারও পরে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। তিনিও দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দারা তাকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে এলে তিনি দুই আঙুল তুলে ভি-চিহ্ন দেখিয়ে বলেন, আমি মহাজোটের প্রতিষ্ঠাতা।

লালখান বাজার মাদ্রাসায় গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরপরই পালিয়ে যান মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী। ২ বছর পলাতক থাকার পর পুনরায় লালখান বাজার মাদ্রাসায় ফেরেন। গ্রেনেড বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়ের করা তিন মামলায় মুফতি ইজহার ও তার ছেলে হারুন ইজহারসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। বিস্ফোরক, এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ও একটি হত্যাসহ তিনটি মামলায় জামিন না নেয়ায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয় মুফতি ইজহারের বিরুদ্ধে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মুফতি ইজাহারুল ইসলামের পরিচালনাধীন লালখান বাজারে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় গড়ে উঠেছিল আন্তঃদেশীয় জঙ্গিদের ঘাঁটি। যেখান থেকে ২০০৯ সালের শেষ দিকে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার ছক তৈরি হয়েছিল।

এ হামলা পরকিল্পনা করেছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন লস্কর ই-তৈয়বা। এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইজহারুল ইসলামের ছেলে হারুন ইজহার। ফের সেখান থেকেই বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ছক কষা হয়েছিল বলে পুলিশ ও গোয়েন্দারা জানান।

২০০৯ সালের শেষ দিকে খবর পাওয়া যায়, যে কোনো সময় ঢাকাস্থ দুটি দূতাবাসে জঙ্গি হামলা হতে পারে। এ তথ্যের ভিত্তিতে ও একটি টেলিফোন কলের সূত্র ধরে জানা গেছে, হামলার ছক মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায় বসেই করা হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত আন্তঃদেশীয় কয়েকজন জঙ্গি মুফতি ইজহারুলের মাদ্রাসায় অবস্থান করছিলেন।

এ তথ্য পেয়েই গোয়েন্দা পুলিশ ওই মাদ্রাসায় অভিযান চালায়, গ্রেপ্তার করা হয় ইজহারপুত্র হারুন ইজহার এবং দক্ষিণ ভারতীয় সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সদস্য ভারতীয় নাগরিক শহিদুল, সালাম, সুজন ও আল আমিন ওরফে মইফুলকে।

সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ওই অভিযানকালে গোয়েন্দা পুলিশ হারুন ইজহারের কক্ষ থেকে একটি ল্যাপটপ জব্দ করে। ওই ল্যাপটপে মার্কিন ও ভারতীয় হাইকমিশনার হামলার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। পুলিশের অভিযান শুরুর আগে সেখান থেকে পালিয়ে যান লস্কর-ই-তৈয়বার অন্যতম শীর্ষনেতা টি নাসির ও সরফরাজ।

ওই বছরের ৬ই নভেম্বর কুমিরা সীমান্ত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দুই ভারতীয় জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়। তারা ভারতের বেঙ্গালুরু কম্পিউটার সিটিতে বোমা হামলাসহ বেশ কয়েকটি বড় সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত। তারা ছিলেন ভারতে মোস্ট ওয়ান্টেড। গ্রেপ্তার এড়াতে দুই জঙ্গি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় মুফতি ইজহারের মাদ্রাসায়।

এর আগে রাউজান রাবার বাগান গোদারপাড় এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় হুজির প্রশিক্ষণকালে অভিযান চালিয়ে জিহাদি বই ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধার করে র‌্যাব। এ ঘটনায় বিস্ফোরক ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটি মামলায় মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীসহ আটজনকে আসামি করা হয়।

২০১০ সালের ১৫ই ডিসেম্বর হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগের র‌্যাব-৭ এর হাতে দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম। হরকাতুল জিহাদের (হুজি) তৎকালীন আমির মাওলানা ইয়াহিয়া ওরফে বর্দ্দা (৪৬) এবং তার দুই সহযোগী মো. বাহাউদ্দিন (২২) ও ইয়ার মোহাম্মদকে (৫০) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াহিয়া জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামে হুজির আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসায় সাংগঠনিক অফিস খোলা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের প্রাণনাশের চেষ্টার অভিযোগে আটক হওয়া কয়েকজন জঙ্গি জানায়- তারা মুফতি ইজহারুল ইসলামের লালখান বাজার মাদ্রাসাতেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

Visited 6 times, 1 visit(s) today