রাজাকারের পোস্টার ঘিরে বিতর্ক: বেরোবিতে ছাত্রদল-শিবির সংঘাতের জেরে উত্তপ্ত বিভিন্ন ক্যাম্পাস

রাজাকারের পোস্টার ঘিরে বিতর্ক: বেরোবিতে ছাত্রদল-শিবির সংঘাতের জেরে উত্তপ্ত বিভিন্ন ক্যাম্পাস
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


জুলাই স্মরণে আয়োজিত প্রদর্শনীতে কুখ্যাত রাজাকার এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত অপরাধীদের ছবি সংবলিত ব্যানার রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদল ও গুপ্ত সংগঠন শিবিরের মধ্যে ব্যাপক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।

এর আগে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) থেকে শুরু হওয়া এই উত্তেজনার রেশ রাজধানী ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।

সংঘাতের জেরে শিবিরের শীর্ষ স্থানীয় একাধিক নেতা আহত হয়েছেন এবং কয়েকটি ক্যাম্পাস থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ছাত্রদল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেরোবি ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।

বেরোবিতে পোস্টার বিতর্ক ও সংঘর্ষের সূত্রপাত

গত সোমবার সন্ধ্যায় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের উদ্যোগে ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উক্ত প্রদর্শনীতে ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ দাবি করে একটি ব্যানারে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াতের সাবেক শীর্ষ পাঁচ নেতা এবং বিএনপির সাবেক এক নেতার ছবি প্রদর্শন করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল তীব্র আপত্তি জানায়।

বেরোবি শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জহির রায়হান অভিযোগ করেন, “প্রদর্শনীতে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ছবি ব্যবহার করে জুলাইর চেতনাকে ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। আমরা এই বিতর্কিত ছবিগুলো অপসারণের দাবি জানালে শিবিরের নেতাকর্মীরা আমাদের ওপর আকস্মিক হামলা চালায়। হামলায় আমাদের সহ-সভাপতি আশিকুর রহমানসহ চারজন কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন।”

অন্যদিকে, বেরোবি শাখা শিবিরের সভাপতি আবদুর রাকিব এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই আমরা শান্তিপূর্ণ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেখানে এসে বাগবিতণ্ডা শুরু করে এবং একপর্যায়ে আমাদের লক্ষ্য করে ভাঙা ইট ও চেয়ার ছুঁড়ে মারে। এতে আমাদের সাবেক সভাপতি সোহেল রানাসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।”

সংঘাতের বিস্তার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে

রংপুরের এই ঘটনার রেশ ধরে রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠান চলাকালীন বেরোবি’র ঘটনার জের ধরে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও মারামারি হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ছাত্রদলের মারমুখী অবস্থানের মুখে জবি শিবিরের সভাপতি ও জবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মো. আব্দুল আলিম আরিফ এবং জবি ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) রিয়াজুল ইসলাম গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে ছাত্রদলের ধাওয়ার মুখে তারা ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হন।

ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যাতে সাংবাদিকসহ অন্তত ২৭ জন আহত হন। ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেন বলেন, “শিবির ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের জন্য পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছিল। কোনো ধরনের উগ্রবাদী কার্যক্রম এই ক্যাম্পাসে বরদাশত করা হবে না।”

অপরদিকে ঢাকা কলেজ শিবিরের অফিস সম্পাদক মামুন শেখ দাবি করেন, “পোস্টার লাগানোর সময় ছাত্রদল আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং আমাদের প্রায় ২০ জন কর্মী আহত হন।”

বকশীবাজারের এই প্রতিষ্ঠানেও আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ ও সিট দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষ লাঠিসোঁটা ও রড নিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায়, যাতে বেশ কয়েকজন রক্তাক্ত হন।

উসকানির নেপথ্যে প্রশাসনের আশঙ্কা

অনভিপ্রেত পরিস্থিতি নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী বলেন, “ভিডিও ফুটেজ দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমাদের আশঙ্কা, সদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কোনো ‘স্লিপার সেল’ বা সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী দুই বৃহৎ ছাত্র সংগঠনের মধ্যে কৃত্রিম বিরোধ তৈরি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য এই উসকানি দিয়ে থাকতে পারে। আমরা সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”

বর্তমানে সংঘাতপূর্ণ ক্যাম্পাসগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today