যেই মানবপাচার সিন্ডিকেট হোতার গ্রেফতার চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার, মালয়েশিয়া সফরে তার সাথেই সাক্ষাত করলেন তারেক রহমান

যেই মানবপাচার সিন্ডিকেট হোতার গ্রেফতার চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার, মালয়েশিয়া সফরে তার সাথেই সাক্ষাত করলেন তারেক রহমান
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

১১ জুলাই, ২০২৬

 

ঢাকা/কুয়ালালামপুর — বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৪ সালের নভেম্বরে যে ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার ও প্রত্যর্পণের জন্য মালয়েশিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠিয়েছিল, চলতি বছরের জুনে মালয়েশিয়া সফরকালে সেই ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলামের সাথেই সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ব্লুমবার্গ নিউজের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।

 

গ্রেফতারের অনুরোধ: ২০২৪ সাল

ব্লুমবার্গের ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ পুলিশ মালয়েশিয়া সরকারের কাছে দুই ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম ও রুহুল আমিনকে গ্রেফতার ও প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়, যা ছিল অর্থপাচার, চাঁদাবাজি ও অভিবাসী শ্রমিক পাচারের অভিযোগে পরিচালিত এক তদন্তের অংশ। বাংলাদেশের ইন্টারপোল শাখা মালয়েশিয়ার প্রতিপক্ষকে পাঠানো ২৪ অক্টোবর তারিখের এক চিঠিতে জানায়, এই দুইজন এমন একটি ব্যবস্থার মূল ভূমিকায় ছিলেন যা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে “প্রতারণামূলকভাবে অর্থ আদায়” করত এবং তাদের “শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের” শিকার করত।

চিঠিতে মালয়েশিয়াকে অনুরোধ করা হয়েছিল, আমিনুলের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি-র তৈরি সফটওয়্যার—যা মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ব্যবহার করে থাকে—তার ব্যবহার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে। বাংলাদেশ-জাত হলেও পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব নেওয়া আমিনুল তখন থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরেই মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অনুরোধ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করে, তবে পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুশন ইসমাইল একাধিকবার বলেছেন, ঢাকার কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের আবেদন তারা এখনো পাননি এবং আমিনুলকে এখন পর্যন্ত প্রত্যর্পণ করা হয়নি।

 

জুনে মালয়শিয়া সফরে সাক্ষাৎ

ব্লুমবার্গের ৮ জুলাই, ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুন মাসে মালয়েশিয়া রাষ্ট্রীয় সফরের সময় কুয়ালালামপুরের জাতীয় প্রাসাদে আমিনুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ করেন—চীন সফরে যাওয়ার আগে। বিষয়টি জানেন এমন একাধিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সাক্ষাতে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণানও উপস্থিত ছিলেন।

 

তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই সাক্ষাৎকে পূর্বনির্ধারিত বা আলাদা কোনো বৈঠক বলে স্বীকার করেনি। প্রধানমন্ত্রীর একজন মুখপাত্র প্রাসাদ পরিদর্শনের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আমিনুলের নাম উল্লেখ করেননি; এক লিখিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, “প্রাসাদে উপস্থিত বেশ কয়েকজনের সাথে আমরা শুভেচ্ছা বিনিময় করেছি।” ব্লুমবার্গ একে “অনির্ধারিত সাক্ষাৎ” হিসেবে বর্ণনা করেছে।

 

কে এই আমিনুল ইসলাম?

আমিনুল ইসলাম, যিনি “আমিন” নামেই বেশি পরিচিত, বাংলাদেশে জন্ম নিলেও এক দশকেরও বেশি আগে মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং বর্তমানে দেশটির অভিজাত মহলের একজন প্রভাবশালী ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। তিনি বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি নামের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, যা ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) নামের সফটওয়্যার তৈরি ও পরিচালনা করে—মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকে।

ব্লুমবার্গের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া যখন এই সিস্টেম গ্রহণ করে, তখন থেকেই বাংলাদেশের এক হাজারেরও বেশি শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০টিকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়—উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়ে, মালয়শিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক অভিবাসনের এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

একাধিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদির সাথে আমিনুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যদিও দুজনই এই সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছেন। সমালোচকদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়োগ ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়—আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে যা বেস্টিনেট-পূর্ব সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ছিল, এবং এই বাড়তি ব্যয়কে “সিন্ডিকেট ফি” বলে অভিহিত করা হতো।

২০২৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশ অর্থপাচার, চাঁদাবাজি ও মানব পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে এবং মালয়েশিয়ার কাছে তাকে গ্রেফতার ও প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়, তবে আমিনুল বরাবরই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন এবং দাবি করেন যে তিনি সারাজীবন অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণেই কাজ করে গেছেন। তার বিরুদ্ধে এখনও কোনো আদালতে অভিযোগ গঠন হয়নি এবং তাকে প্রত্যর্পণও করা হয়নি।

 

মালয়শিয়ায় শ্রমিকপাচার সিন্ডিকেটের বদৌলতে ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য

মালয়েশিয়া-ভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নেটওয়ার্ক এশিয়ান ডিসপ্যাচ (মালয়েশিয়াকিনি ও প্রথম আলোর যৌথ অনুসন্ধান) অনুযায়ী, আমিনুল ইসলাম আবদুল নূরের জন্ম বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, যেখানে এখনো তার নামে “আমিনুল ইসলাম প্লাজা” নামের একটি স্থাপনা রয়েছে। প্রায় তিন দশক আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানো আমিনুল সেখানে রুসিলাওয়াতি মোহাম্মদ ইউসুফ নামের এক মালয়েশীয় নারীকে বিয়ে করেন, যার সূত্র ধরেই তিনি মালয়েশিয়ার নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং স্ত্রীর সাথে মিলে অভিবাসী শ্রমিক ব্যবস্থাপনার ব্যবসা শুরু করেন। মালয়েশিয়ায় তিনি “দাতুক শ্রী আমিন” উপাধিধারী এবং স্থানীয়ভাবে অনেকের কাছে “আমিন বাংলা” নামেও পরিচিত। বিনয়ী পটভূমি থেকে উঠে আসা আমিনুল পরবর্তীতে মন্ত্রী ও রাজপরিবারের সদস্যদের সাথে ছবি তোলা এবং শত কোটি রিঙ্গিত মূল্যের কর্পোরেট চুক্তিতে যুক্ত হওয়া এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

তিনি বেস্টিনেট এসডিএন বিএইচডি প্রতিষ্ঠা করেন, যার তৈরি ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) ২০১৭ সালে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কাঠামোর আওতাধীন ওয়ার্ল্ড সামিট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তিনি বেস্টিনেটের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ান, তবে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার হিসেবে এখনও যুক্ত আছেন। এছাড়া তিনি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান জি৩ গ্লোবাল বারহাদের পরিচালক ও উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার—যে প্রতিষ্ঠানটি কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মালদ্বীপে অভিবাসী শ্রমিকদের আবাসন সুবিধা পরিচালনার মতো বড় বড় সরকারি চুক্তি পেয়েছে। তার ছেলে মুহাম্মদ খায়লিজ নরমান আমিনুল ইসলাম—যিনি কুয়ালালামপুরের একটি আন্তর্জাতিক স্কুল ও লন্ডনের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন—বর্তমানে জি৩ গ্লোবালের একজন উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার এবং ভবিষ্যতে বাবার এই ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হতে পারেন বলে ধারণা করা হয়।

২০২২ সালে মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন (এমএসিসি) বেস্টিনেটের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তদন্ত শুরু করলেও, ২০২৪ সালে সংস্থাটি জানায় এই তদন্তে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মেলেনি এবং বিষয়টি “নো ফারদার অ্যাকশন” হিসেবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমিনুলের আইনজীবী দাবি করেছেন, এফডব্লিউসিএমএস ব্যবস্থাটি বিদেশি শ্রমিকদের শোষণ থেকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি এবং প্রকৃত নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আমিনুল বা বেস্টিনেটের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই।

 

পটভূমিঃ মালয়শিয়ায় সিন্ডিকেট চক্রে জিম্মি বাংলাদেশী শ্রমিকরা

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশেই দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। শ্রমিকদের প্রায়ই বিপুল অংকের ঋণে জর্জরিত হতে হয়, এবং প্রতিশ্রুত অনেক চাকরিও শেষ পর্যন্ত মেলে না। আমিনুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তার প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক ভূমিকার সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছ থেকে অন্যায্য অতিরিক্ত ফি আদায় করা হয়েছে—যদিও তিনি এই অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।

 

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান গত এপ্রিলে বেস্টিনেটের একটি নতুন সফটওয়্যার ব্যবস্থা (TURAP) গ্রহণের পক্ষে সুপারিশ করেছিলেন—একই প্রতিষ্ঠান, যা নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ ২০২৪ সালে ব্যবহার বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছিল। আনোয়ার ইব্রাহিমের জোটেরই সাত জন সংসদ সদস্য গত ২৯ জুন এক যৌথ বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলেন, “কেন বেস্টিনেটকে আবারও মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থার কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে?”

 

আমিনুলকে প্রতিনিধিত্বকারী আইনি প্রতিষ্ঠান এই সাক্ষাৎ নিয়ে ব্লুমবার্গের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কার্যালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর সফরে মালয়েশিয়ার সাথে অভিবাসী শ্রমবাজার পুনরায় চালু, নিয়োগ খরচ কমানো ও শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে।

আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আদালতে অভিযোগ গঠন হয়নি এবং তিনি বরাবরই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।


তথ্যসূত্র
:
১। ০৫/১১/২০২৪-এ প্রকাশিত  ব্লুমবার্গের  প্রতিবেদন।
২।  ০৮/০৭/২০৬-এ প্রকাশিত ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন।

 

Visited 15 times, 1 visit(s) today