❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার সাম্প্রতিক ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও তার আশপাশের এলাকায় অন্তত ২৩ জন নিহত হয়েছেন।
এই হামলার পরপরই ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী স্বীকার করেছে যে, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের তীব্র ঘাটতির কারণে রাশিয়ার ছোঁড়া ২৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটিও তারা ভূপাতিত করতে পারেনি।
গত এক সপ্তাহে এটি কিয়েভের ওপর রাশিয়ার দ্বিতীয় বড় ধরনের হামলা।
কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, শুধু কিয়েভ শহরেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন, আর আশপাশের এলাকায় মারা গেছেন আরও আট জন। ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীতে আহত হয়েছেন ৫৬ জন, যাদের মধ্যে সাতজন শিশু, এবং কিয়েভ অঞ্চলের অন্যান্য স্থানে আহতের সংখ্যা ৪৮।
রোববার রাতের এই হামলায় রাশিয়া মোট ৬৮টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৫১টি আক্রমণকারী ড্রোন ব্যবহার করে বলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন।
তার ভাষ্যমতে, ইউক্রেনীয় বাহিনী ৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩২৬টি ড্রোন ভূপাতিত বা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে, তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
জেলেনস্কি এই ব্যর্থতাকে আধুনিক বিশ্বের জন্য অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করে বলেছেন, মানুষকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত উৎপাদন এখনও গড়ে ওঠেনি।
কিয়েভের পোদিলস্কি এলাকায় একটি আবাসিক ভবনের মাঝ বরাবর বিশাল গর্ত সৃষ্টি হয়েছে সরাসরি আঘাতে। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করতে প্রশিক্ষিত কুকুরের সাহায্য নিচ্ছে, আর ক্রেন দিয়ে সরানো হচ্ছে ধসে পড়া কংক্রিটের স্লযাব।
শহরের অন্তত তিনটি বহুতল ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়েছে। আকাশে হেলিকপ্টার নদী থেকে পানি বহন করে আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই তাদের সর্বস্ব হারিয়ে থানায় ক্ষয়ক্ষতির নিবন্ধন করাতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন।
এক নারী জানান, বিস্ফোরণের পর জানালার কাচ ভেঙে তাদের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে। ক্লান্তির কারণে সাইরেন বাজার পরও তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি বলে জানান। চার বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে মানুষ যেভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তার মধ্যেই আকাশপথে হামলার তীব্রতা আরও বেড়ে চলেছে।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই জেলেনস্কি সতর্ক করেছিলেন যে গত বৃহস্পতিবারের হামলার ধারাবাহিকতায় মস্কো কিয়েভে আরও একটি বড় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে; বৃহস্পতিবারের ওই হামলায় ৩০ জন নিহত হয়েছিলেন এবং ইউক্রেন সেটিকে বেসামরিক এলাকায় ইচ্ছাকৃত হামলা বলে অভিযোগ করেছিল।
অন্যদিকে রাশিয়া দাবি করেছিল, রুশ ভূখণ্ডে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তারা সামরিক ও জ্বালানি ঘাঁটি লক্ষ্য করেই আঘাত হেনেছিল।
এদিকে ইউক্রেনও রুশ জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে রুশ-দখলকৃত ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপল শহরে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা রাশিয়ার তিনটি তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে রয়েছে ওমস্কে অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে বড় শোধনাগার—যা কিয়েভ থেকে প্রায় ২,৪১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং ইউক্রেনের এ পর্যন্ত পরিচালিত দূরপাল্লার হামলাগুলোর একটি।
অপরদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ইউক্রেন ৬২৫টি দূরপাল্লার আক্রমণকারী ড্রোন ছুঁড়েছিল, যার মধ্যে ৬১৩টি তারা ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে।
জেলেনস্কি মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, এই সপ্তাহে তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে যেন কিয়েভকে বিমান প্রতিরক্ষা সরবরাহের বিষয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠক হতে পারে।
জেলেনস্কি বলেছেন, যতদিন মিত্রদের হাতে থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে না পৌঁছাচ্ছে, ততদিন মস্কো আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের হাতে এই সন্ত্রাস থামানোর মতো যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডেয়ার লাইয়েন জানিয়েছেন, ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা সহায়তার জরুরি প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ন্যাটো সম্মেলনে আলোচনা হবে।
mউল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করা রাশিয়া বর্তমানে দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
