❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি অর্থ জলে ঢালার নয়া নজির তৈরি হয়েছে বগুড়া সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়নে। জলাবদ্ধতা নিরসন করে কৃষকদের দুর্ভোগ ঘোচাতে প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে সুফলের চেয়ে এলাকাবাসীর কপালে জুটেছে আরও বড় দুর্ভোগ।
প্রাক্কলন (এস্টিমেট) ফাঁকি দিয়ে নিম্নমানের কাজ, নামমাত্র বৃক্ষরোপণ এবং শ্রমিকদের মজুরি জালিয়াতির মাধ্যমে পুরো প্রকল্প গিলে খাওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা সূত্র জানায়, সদরের এরুলিয়া ও লাহিড়ীপাড়া ইউনিয়নে এই দুই মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর মধ্যে এরুলিয়া ইউনিয়নে শিকারপুর পূর্বপাড়া হিন্দুপাড়া হতে চতরা অভিমুখে খাল পুনঃখনন ও ৪ কিলোমিটার বৃক্ষরোপণের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ দাবি করা হলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন।
অন্যদিকে, লাহিড়ীপাড়া ইউনিয়নে দোবাড়িয়া একদুলতলা হতে পীরগাছা ইছামতি নদী পর্যন্ত ০.৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে কাগজে-কলমে শেষ দেখানো হয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও কৃষকদের অভিযোগ, এরুলিয়ার শিকারপুর ও কৃষ্ণপুর গ্রামে যেখানে ১৬ ফুট প্রস্থ ও ১০ ফুট গভীর খাল খনন করার কথা ছিল, সেখানে মাটি কাটা হয়েছে নামমাত্র। অনেক জায়গায় খালটিকে দেখে মনে হয় একটি সরু ড্রেন বা নালা। পানিপ্রবাহের জন্য অত্যন্ত জরুরি তিনটি কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও তা দৃশ্যমান নয়।
প্রকল্পের আওতায় হাজার হাজার গাছের চারা রোপণের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে কিছু চারা লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে। ফলে আসন্ন বর্ষায় জলাবদ্ধতা দূর হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো কৃত্রিম বন্যার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন কয়েক হাজার গ্রামবাসী।
এলাকাবাসীর আকুতি, “আমরা ভেবেছিলাম এবার বর্ষায় পানি জমবে না, চাষাবাদ ভালো হবে। কিন্তু তারা কোটি টাকা বরাদ্দ এনে খালটাকে নালা বানিয়ে দিল! আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই, যেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে নেওয়া এই প্রকল্পের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষ পায়।”
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই প্রকল্পে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হয়েছে দিনমজুরদের রক্ত পানি করা মজুরি নিয়ে।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্পের শ্রমিকদের নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার কথা থাকলেও, এরুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নিজস্ব লোকজন ব্যাংক থেকে চেকের মাধ্যমে টাকা তুলে নিজেদের মতো ভাগবাঁটোয়ারা করে বিতরণ করেছেন।
এতে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে খোদ শ্রমিকরাই অভিযোগ তুলেছেন।
এই ভয়াবহ অনিয়মের বিষয়ে এরুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আতিকুর রহমান আতিক কিছুটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “কাজের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি, অভিযোগগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি।” তবে কৃষকদের ধান নষ্ট হওয়ার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে, লাহিড়ীপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান জুলফিকার আবু নাসের আপেল তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার ২১ লাখ টাকার প্রকল্পে কোনো অনিয়ম হয়নি। সরকারি সংস্থাগুলো কাজের প্রশংসা করেছে, কিছু মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়ে মিথ্যাচার করছে।”
কোটি টাকার প্রকল্পে এমন পুকুরচুরির অভিযোগ ওঠার পর টনক নড়েছে জেলা প্রশাসনের। বগুড়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল ওয়াজেদ এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ নতুন করে কঠোরভাবে তদারকি করা হবে।
এ বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সরকারি প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখতে তদন্ত সাপেক্ষ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
এলাকাবাসী আশা করছেন, প্রশাসনের এই আশ্বাস শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত কার্যকর হবে এবং দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।
