সেনানিবাসে সামরিক সরঞ্জাম অ্যাসেম্বলিংয়ের জন্য জায়গা পাচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি এল৩ হ্যারিস

সেনানিবাসে সামরিক সরঞ্জাম অ্যাসেম্বলিংয়ের জন্য জায়গা পাচ্ছে মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি এল৩ হ্যারিস
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক


অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়লগ্নে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা কোম্পানি এল৩ হ্যারিসের সঙ্গে রেডিও কমিউনিকেশন ডিভাইসের প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত একটি গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

‘করাপশন ইন মিডিয়া’ (সিআইএম)-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এসেছে, যেখানে সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর সংশ্লিষ্ট দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।

নথিতে কী আছে

প্রতিবেদনে দেখানো একটি দলিল অনুযায়ী, এল৩ হ্যারিসের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ৩০শে নভেম্বর তারিখে একটি ‘আরএফপি রেসপন্স’ (RFP Response) জমা দেওয়া হয়, যার শিরোনাম— “Bangladesh Army Request for Final Proposal on Transfer of Technology (ToT) for Local Production of Communication Equipment”।

এই প্রস্তাবের সলিসিটেশন নম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে 23.01.901.032.03.079.01.16.09.25। দলিলটির উপশিরোনামে লেখা— “A Decade of Partnership: From Tactical Readiness to Production Capability”।

দলিলে প্রাপকের তালিকায় রয়েছে সেনা সদর দপ্তর, জেনারেল স্টাফ ব্রাঞ্চ, সিগন্যালস ডিরেক্টোরেট এবং ঢাকা সেনানিবাস।

প্রস্তাবটি জমা দিয়েছেন এল৩ হ্যারিসের পক্ষে জেমস এনজি টেক ইয়ং, যার পদবি হিসেবে দেখানো হয়েছে— সিনিয়র ম্যানেজার, সেলস/অ্যাকাউন্ট, সাউথ এপিএসি, হ্যারিস গ্লোবাল কমিউনিকেশনস।

প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা দেখানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রচেস্টার শহরের ১৬৮০ ইউনিভার্সিটি অ্যাভিনিউ।

দলিলের নিচে একটি সতর্কীকরণ নোটও রয়েছে, যেখানে বলা আছে এই দলিলের তথ্য আইটিএআর (ITAR) পার্ট ১২০.৩৩ বা ইএআর (EAR) পার্ট ৭৭২-এর আওতায় ‘নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিগত তথ্য’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত নয় এবং এটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ও গোপনীয় তথ্য হিসেবে বিবেচিত— যা তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে প্রকাশ বা পুনরুৎপাদন করা যাবে না।

চুক্তির অঙ্ক ও গোপনীয়তা

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ)-এর আওতায় সামরিক খাতে এই বিশাল চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

এনডিএর কারণে চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্যান্টনমেন্টে অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্টের জন্য জায়গা

প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য— সেনানিবাসের অভ্যন্তরে সামরিক যোগাযোগ সরঞ্জাম স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বা অ্যাসেম্বলিংয়ের জন্য একটি স্থাপনা গড়ে তোলার লক্ষ্যে মার্কিন এই প্রতিরক্ষা কোম্পানিকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

দলিলের শিরোনামে থাকা “Local Production of Communication Equipment” বাক্যাংশটি থেকেও এই ইঙ্গিত মেলে যে, প্রকল্পটি কেবল রেডিও সরঞ্জাম সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশের মাটিতেই উৎপাদন-সক্ষমতা তৈরির একটি পরিকল্পনা এতে রয়েছে।

প্রতিবেদনে দেখানো ছবিতে এল৩ হ্যারিসের লোগো এবং সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত রেডিও যোগাযোগ যন্ত্রপাতির পাশাপাশি একটি নির্মাণাধীন স্থাপনার দৃশ্যও দেখা যায়, যা সম্ভাব্য অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্টের অবস্থান নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অনুমান করা যায়।

পরিচিতি ও পেছনের যোগসূত্র

প্রতিবেদনে এমন কয়েকজন ব্যক্তির ছবি দেখানো হয়েছে, যাদের এই চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

তাদের মধ্যে অন্যতম মঞ্জুর হসেন জিম্মু, সিইও, অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনাল। উক্ত প্রতিষ্ঠানের সাথে আরও যুক্ত আছেন মঞ্জুর হোসেন জিম্মুর স্ত্রী এবং অবসরপ্রাপ্ত এক মেজর, যার নাম খলিল বিন ওয়াহিদ।

গোপন সুত্র বলছে, মঞ্জুর হোসেন ও খলিল বিন ওয়ালিদ, দুজনেই সেনাপ্রধানের খুব কাছের বন্ধু, এবং এই সুত্রেই তারা প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন কাজ করছেন।

১,১১৭ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন

সিআইএমের প্রতিবেদনে এই চুক্তি ও প্রকল্পের মোট ব্যয়— ১,১১৭ কোটি টাকা— নিয়ে বিস্তারিতভাবে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। চুক্তি ও প্রকল্পের প্রকৃতি নিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন উঠেছে, এল৩ হ্যারিসের সঙ্গে যে সমঝোতা হয়েছে তা আসলে প্রকৃত প্রযুক্তি হস্তান্তর প্রকল্প, নাকি স্রেফ যন্ত্রপাতি সংযোজন বা অ্যাসেম্বলিং প্রকল্প— এ দুটির মধ্যে বাস্তবে কোনটি ঘটছে, তা স্পষ্ট নয়।

দ্বিতীয়ত, এনডিএর আওতায় পুরো চুক্তিটি গোপন রাখার প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা কী ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে— বিশেষত যখন এটি জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটি সামরিক ক্রয়-প্রকল্প।

দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়েও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক টেন্ডার প্রক্রিয়ার প্রচলিত নিয়ম-কানুন এই ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।

এছাড়া সাধারণত ৪৮ দিনের মতো সময় বরাদ্দ থাকার প্রথা থাকলেও এই টেন্ডার প্রক্রিয়া কেন মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করা হলো, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে— এত গুরুত্বপূর্ণ ও বড় অঙ্কের একটি সামরিক ক্রয়ে সময়সীমা এত সংকুচিত করার পেছনে কারণ কী।

সেইসঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, এল৩ হ্যারিসের পাশাপাশি অন্য আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকেও কি এই টেন্ডারে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, নাকি প্রক্রিয়াটি কার্যত একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির দিকেই পরিচালিত হয়েছে।

আর শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় ১,১১৭ কোটি টাকা কীভাবে এবং কোন ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হলো, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাও মেলেনি।

আরও যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি

উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে উঠে আসছে:

  • ১,১১৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অর্থায়ন কোন উৎস থেকে হবে— সরকারি বাজেট, প্রতিরক্ষা বাজেট বরাদ্দ, নাকি কোনো বৈদেশিক ঋণ বা সহায়তার মাধ্যমে?
  • প্রকল্পটি যদি প্রকৃতপক্ষে প্রযুক্তি হস্তান্তরের (ToT) আওতায় হয়, তাহলে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরিতে এর সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা সময়সীমা কী রয়েছে?
  • অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে এত বড় অঙ্কের একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক চুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্ত কার অনুমোদনে এবং কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হলো?
  • ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকার এই চুক্তির শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা বা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ রাখবে কি না, অথবা এনডিএ-র কারণে তা কার্যত বাধ্যতামূলক হয়ে থাকবে কি না?
  • সেনাবাহিনীর সিগন্যালস ডিরেক্টোরেট ও জেনারেল স্টাফ ব্রাঞ্চ ছাড়া এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় বা সংসদীয় কোনো তদারকি কমিটির সম্পৃক্ততা ছিল কি না?
  • এল৩ হ্যারিসের ইতিপূর্বে অন্য কোনো দেশে সম্পাদিত একই ধরনের ‘প্রযুক্তি হস্তান্তর’ চুক্তিতে প্রকৃতপক্ষে কতটা প্রযুক্তি স্থানীয়ভাবে হস্তান্তরিত হয়েছিল— তার কোনো তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি?
  • এই চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে কোম্পানিটির কাছ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ বা সফটওয়্যার আপডেটের জন্য দেশকে দীর্ঘমেয়াদে কতটা নির্ভরশীল থাকতে হবে?

মার্কিন একটি প্রতিরক্ষা কোম্পানিকে দেশের সামরিক বাহিনীর সেনানিবাসের অভ্যন্তরে যোগাযোগ সরঞ্জাম অ্যাসেম্বলিংয়ের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়া এবং তা নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টের আওতায় গোপন রাখার বিষয়টি সার্বিকভাবে এই প্রকল্পের কার্যকারিতা, খরচের যথার্থতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এ বিষয়ে সেনাবাহিনী বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি এখনো পাওয়া যায়নি।

Visited 15 times, 1 visit(s) today