❐ ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
বট আইডি ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) এক নারী শিক্ষার্থীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ভাষায় বুলিং এবং হেনস্তা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুপ্ত সংগঠন শিবিরের এক নেতার বিরুদ্ধে।
ঘটনাটি ঘটে শনিবার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ নামক একটি ফেসবুক গ্রুপে একটি পোস্টের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর নাম আলি আহসান মোজাহিদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের নেতা হিসেবে পরিচিত।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, শামসুন নাহার হল ও হল সংসদ সংক্রান্ত একটি পোস্টে রুমি নামের এক নারী শিক্ষার্থী মন্তব্য করেন। এরপর ‘ScenicLizard7729’ নামের একটি বট অ্যাকাউন্ট থেকে ওই নারী শিক্ষার্থীকে অত্যন্ত অশ্লীল ও আপত্তিজনক ভাষায় আক্রমণ করে জবাব দেওয়া হয়।
মন্তব্যে তাকে ‘আইছে বাম ব্যাশা মাগী’ বলে সম্বোধন করা হয়। পরবর্তীতে অনুসন্ধান করে ভুক্তভোগী জানতে পারেন, ওই বেনামি অ্যাকাউন্টের পেছনে রয়েছেন গুপ্ত সংগঠন শিবির নেতা মোজাহিদ।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর রুমি সরাসরি তাকে বার্তা পাঠালে মোজাহিদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হন। তবে তিনি দাবি করেন, তাকে এই কাজ করার জন্য ‘লেলিয়ে’ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী নারী শিক্ষার্থীর কাছে ক্ষমাও চান তিনি।
ভুক্তভোগী রুমি এ বিষয়ে বলেন, ‘একটি পোস্টে আমি কমেন্ট করলে সেখানে এক বট আইডি থেকে আমাকে অশ্লীল ভাষায় রিপ্লাই দেওয়া হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে ওই আইডির মালিক আমার লিস্টেরই একজন। আমরা একসঙ্গে কয়েকটি প্রোগ্রামে ছিলাম এবং আমি আমার ছোটোভাই হিসেবে পরিচয়ও দিতাম তাকে।
তিনি নিজে অনেকবার দাবি করেছে — সে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত।’
গ্রুপ অ্যাডমিনদের উদ্দেশ করে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আপনারা গ্রুপের বাউন্ডারি সেট করেন। এমন আর কত? এসব বট আইডি থেকে ক্রমাগত হয়রানি আর আক্রমণাত্মক কমেন্ট করা হয়, আপনারা কেন এদের অপসারণ করেন না?’
ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে।
ইসলামী ছাত্র মজলিসের সভাপতি সাকিব মাহমুদ রুমি তার ফেসবুকে লেখেন, ‘ছোটভাই দুই দিন আগেও দেখলাম স্লোগান দিচ্ছে — আদর্শে শিবির, সংগ্রামে শিবির। আজকে সে একজন নারী শিক্ষার্থীকে বাম বেশ্যা মাগী বলার মাধ্যমে আদর্শ বাস্তবায়ন করেছে।’
চাকসুর ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক তার ফেসবুকে লেখেন, ‘নারীর প্রতি প্রতিহিংসা এবং নারীদের নিয়ে বুলিংকারী সে যে-ই হোক না কেন, তাকে যথাযথ শাস্তির আওতায় আনা দরকার। কোনো ধরনের মার্সি চলবে না। দল-মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে; কিন্তু ভাষা প্রয়োগের আদব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর থাকা প্রয়োজন, যেটা ছেলেটি লিমিট ক্রস করেছে।’
চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, ‘শিবিরকর্মী আলী আহসান মুজাহিদ একজন নারী শিক্ষার্থীকে যে ভাষায় ও যে ধরনের বাজে শব্দচয়নের মাধ্যমে আক্রমণ করেছে, সেটিকে আমি শিবিরের প্রকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি। এটি প্রমাণ করে, তাদের একটি বটবাহিনী রয়েছে, যারা বিভিন্নভাবে মানুষকে হেনস্তা করার কাজে জড়িত। ওই শিক্ষার্থী মোজাহিদ তাকে লেলিয়ে দেওয়ার যে দাবি করেছে, আমরা অবশ্যই জানতে চাই, কারা এর পেছনে উসকানিদাতা।’
চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব এ ঘটনায় কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নারী শিক্ষার্থীকে বুলিং বা হয়রানি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলে দল-মত-নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে চাকসু। কোনো শিক্ষার্থীর আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে চাকসুর লিগ্যাল এইড সেল থেকে বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করে অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে চাকসু।’
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হোসেন শহীদ সরওয়ার্দীকে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে প্রশাসনের অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখযোগ্য যে, অভিযুক্ত মোজাহিদ নিজেই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে দাবি করেছেন যে তাকে এই কাজে ‘লেলিয়ে’ দেওয়া হয়েছে — যা প্রশ্ন তুলেছে একটি সংগঠিত ‘বটবাহিনী’র অস্তিত্ব নিয়ে। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন হয়রানি ও নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
