মিজানুর হক খান
সভাপতি, জার্মান আওয়ামী লীগ
১৯৮১ সালের ১৭ই মে ছিল এক মেঘাচ্ছন্ন ও ঝোড়ো দিন। কিন্তু প্রকৃতির সেই বৈরী রূপ ছাপিয়ে সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে বইছিল আবেগের প্লাবন। রাজধানী ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে শুরু করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত জনসমুদ্রের একমাত্র ধ্বনি ছিল— “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।” এই দিনটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রীর দেশে ফেরার দিন ছিল না, বরং এটি ছিল ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এর কালরাত্রিতে পথ হারানো বাংলাদেশের পুনর্জন্মের দিন।
১৯৭৫ সালের সেই বিভীষিকাময় রাতে যখন ঘাতকের বুলেটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে শহিদ হন, তখন জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। দীর্ঘ ৬ বছরের প্রবাস জীবন ছিল তাঁদের জন্য এক দুঃসহ যাতনা ও অনিশ্চয়তার ইতিহাস। ভারত থেকে শুরু করে লন্ডনের রাজপথ—সবখানেই তাঁদের ছুটতে হয়েছে জীবন ও নিরাপত্তার তাগিদে। কিন্তু ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে নির্বাসিত শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করার পর তাঁর দেশে ফেরার পথ প্রশস্ত হয়।
১৭ই মে দুপুরে যখন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং বিমানে শেখ হাসিনা ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, তখন অঝোরে বৃষ্টি ঝরছিল। সেই বৃষ্টিতে ভিজে বিমানবন্দর থেকে মিছিল নিয়ে যখন তিনি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পৌঁছান, তখন ঘড়িতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা।
কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি সেদিন বলেছিলেন, “আমি নেতা হতে আসিনি, আমি আপনাদের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিতে এসেছি।” তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ছিল স্বৈরশাসক জিয়ার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ফলেই বাংলাদেশ আবার তার মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ধারায় ফিরে আসতে সক্ষম হয়। দীর্ঘ একুশ বছরের সংগ্রাম শেষে তিনি দেশকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের যে রূপান্তর, তার মূল ভিত্তি রচিত হয়েছিল সেই ১৯৮১ সালের ১৭ই মে।
তবে বর্তমানে ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আবার এক কঠিন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে উপস্থিত। বিগত কয়েক বছরে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলে তারেক রহমানের প্রভাব দেশের স্থিতিশীলতাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ড. ইউনূসের শাসনামলে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা এবং মাঠপর্যায়ের রাজনীতির সাথে বিচ্ছিন্নতা দেশকে এক অরাজক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অন্যদিকে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থান দেশকে অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার উপক্রম করেছে। আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি, বিরোধী মত দমনে জবরদস্তি এবং সুশাসনের অভাবে দেশের সাধারণ মানুষ আজ আতঙ্কিত। জিয়ার আমলের মতোই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতাকে পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশে বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাব, অনিয়ন্ত্রিত গণপিটুনি ও মব কালচারের বিস্তার এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা মূলত শেখ হাসিনার সুদৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণেই তৈরি হয়েছে। তাঁর শাসনামলে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং সুসমন্বিত স্বাস্থ্য অবকাঠামো বিদ্যমান ছিল, যা যেকোনো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলা এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাৎক্ষণিক ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে সরকারি সংস্থাসমূহ আজ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ও ভেঙে পড়েছে।
এই প্রশাসনিক পক্ষাঘাতের ফলেই একদিকে যেমন সময়মতো টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়ে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতিতে দেশজুড়ে মব কালচার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে। সামগ্রিকভাবে, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নেতৃত্বের অভাব কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল ও অকার্যকর করে তোলে এবং জনগণকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও অনিরাপত্তার দিকে ঠেলে দেয়, বর্তমান বাংলাদেশের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তারই এক বাস্তব প্রমাণ।
এই চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মাঝে বাংলাদেশের আপামর জনতা আজ আবারো সেই ১৯৮১ সালের মতোই শেখ হাসিনার ফেরার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। দেশের উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে এবং মেগা প্রজেক্টগুলো সফলভাবে সমাপ্ত করতে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।
মানুষ বিশ্বাস করে, একমাত্র শেখ হাসিনাই পারেন বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আজ সারা দেশ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই দিনটির জন্য, যখন গণতন্ত্রের মানসকন্যা আবারও বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে জাতিকে মুক্তি দেবেন। আজকের ১৭ই মে তাই কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি প্রেরণা—দেশকে রক্ষা করার এবং সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে এগিয়ে যাওয়ার শপথ।
মিজানুল হক খান – সভাপতি জার্মান আওয়ামী লীগ
