রাবিতে জামায়াতীকরণের হিড়িক: ৫৫৭ দিনে ৪৭৮ নিয়োগে লেনদেন শতকোটি টাকা, উপেক্ষিত শিক্ষাগত যোগ্যতা

রাবিতে জামায়াতীকরণের হিড়িক: ৫৫৭ দিনে ৪৭৮ নিয়োগে লেনদেন শতকোটি টাকা, উপেক্ষিত শিক্ষাগত যোগ্যতা
শেয়ার করুন

❐ ক্যাম্পাস প্রতিনিধি


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। দুটি স্বর্ণপদকে ভূষিত হয়েছেন। ২০১৪ সালে এমফিল এবং ২০১৯ সালে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় মেধা তালিকায় উঠেছেন দ্বিতীয় স্থানে। তবুও চাকরি পাননি এ সালাম।

তার জায়গায় নিয়োগ পেয়েছেন মেধা তালিকার চতুর্থ স্থানের প্রার্থী। শুধু তাই নয়, নিয়োগ বোর্ডের বিশেষজ্ঞ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ইস্রাফিল এই অনিয়ম বুঝতে পেরে চূড়ান্ত ফলের নথিতে সই করতে অস্বীকৃতি জানান।

তারপরও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট নিয়োগটি অনুমোদন দেয় এবং সদ্যঃসাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব তা বৈধ করেন।

এই একটি ঘটনা নয়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, অধ্যাপক নকীব তার ৫৫৭ দিনের উপাচার্য মেয়াদে মোট ১৫টি সিন্ডিকেট বৈঠকের মাধ্যমে কমপক্ষে ৪৭৮ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন।

এদের মধ্যে রয়েছেন ১৫৪ জন শিক্ষক, ছয়জন চিকিৎসক, তিনজন কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩১৫ জন কর্মচারী। এই নিয়োগগুলোর অধিকাংশ নিয়েই অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও জামায়াতীকরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে এত বেশি নিয়োগ এর আগে কোনো উপাচার্য দেননি।

মেধাবীকে বঞ্চিত করে চতুর্থজনকে নিয়োগ

উর্দু বিভাগের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে কারচুপির ঘটনা ঘটেছে, তা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

প্রার্থী এ সালাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে স্নাতক ও ২০০৯ সালে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ভাইভা বোর্ড তাকে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রেখে সুপারিশ করলেও প্রশাসন সেই সুপারিশ উপেক্ষা করে তার পরিবর্তে চতুর্থ স্থানধারীকে নিয়োগ দেয়।

বিষয়টি নিয়ে গত ২৪ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লিগ্যাল সেলে ই-মেইলে লিখিত অভিযোগ দেন এ সালাম।

তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অধিক যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে কম যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়েছে। মেধার ভিত্তিতে তালিকা করেও আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা স্পষ্টই বৈষম্য, অন্যায় ও বড় ধরনের জালিয়াতি। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ শিক্ষকের সই ছাড়াই সিন্ডিকেটে নিয়োগটি পাস করেছে। নতুন প্রশাসন এই বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে আমি আইনের সহায়তা নেব।”

শিক্ষক নিয়োগে চিঠি — নজিরবিহীন তাগাদা

উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাপক নকীব রেজিস্ট্রার দপ্তরের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠান। কোনো কোনো বিভাগে দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করতে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত তাগাদাও দেওয়া হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে কোনো উপাচার্যকে এভাবে শিক্ষক নিয়োগে বিভাগে চিঠি ইস্যু করতে দেখা যায়নি বলে জানান দীর্ঘদিনের শিক্ষকরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপক বলেন, “৩০ বছর ধরে এখানে শিক্ষকতা করছি। এ সময়ের মধ্যে অনেক উপাচার্যকে দেখেছি। তবে নকীব স্যার ছাড়া কোনো উপাচার্যকে এখন পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ দিতে বিভাগে চিঠি ইস্যু করতে দেখিনি।”

এইচএসসি পাসেই প্রথম শ্রেণির চাকরি

সাবেক উপাচার্যের মেয়াদে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো এইচএসসি পাসধারী দুজনকে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মোমেন খন্দকার অপি নামে এক শিক্ষার্থীর স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারে অ্যাডহক ভিত্তিতে সহকারী প্রোগ্রামার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

অর্থাৎ, কার্যত এইচএসসি পাসের সনদেই তিনি প্রথম শ্রেণির চাকরি পেয়ে যান, যা চাকরি বিধিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

একই পদে শরিফুল ইসলাম নামে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি নিয়োগের সময় ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করার দাবি করলেও পরে সনদ দেখাতে পারেননি। ফলে কয়েক মাস পরই তার চাকরি বাতিল হয়ে যায়।

একটি শূন্য পদে ১০ জনের বিজ্ঞপ্তি

গত ১৫ই অক্টোবর ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিভাগে ইউজিসি অনুমোদিত একটিমাত্র শূন্য পদের বিপরীতে ১০ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২০তম ও ৫৪১তম সিন্ডিকেট সভায় বিভাগটিতে ৯টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হলেও ইউজিসি তখনো সেগুলো অনুমোদন দেয়নি।

ইউজিসির অনুমোদনের অপেক্ষা না করেই সব পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ইউজিসির নিয়োগ নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। পরে সংবাদ প্রকাশিত হলে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

ডিনের ভাইকে নিতে নীতিমালা পরিবর্তন

চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে গত বছরের মে মাসে দুই বছরমেয়াদি মাস্টার্স ডিগ্রির শর্ত যুক্ত করা হয়। অথচ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই এক বছরমেয়াদি মাস্টার্স ডিগ্রি প্রদান করে।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলীর ভাই রাবি থেকে স্নাতক করে বিশ্বভারতী থেকে দুই বছরের মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। তাকে সুবিধা দিতেই এই শর্ত যোগ করা হয়। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর এই নিয়োগ কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।

নাট্যকলায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ও ফরেনসিক সত্যতা

গত ১৫ই সেপ্টেম্বর নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েও মৌখিক পরীক্ষায় মনোনীত না হওয়া প্রার্থী রাহাত ইসলাম হৃদয় বিভাগীয় সভাপতি মীর মেহবুব আলমের সঙ্গে আড়াই মিনিটের একটি ফোনালাপের রেকর্ড সংযুক্ত করে উপাচার্যের কাছে অভিযোগ দেন।

রেকর্ডটিতে রাজনৈতিক যোগাযোগে উৎসাহ দেওয়া, আর্থিক লেনদেনের ইঙ্গিত এবং ব্যক্তিগত সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে কথোপকথন ছিল।

সভাপতি রেকর্ডটিকে এআই-নির্মিত বলে দাবি করলেও পরবর্তীতে ফরেনসিক পরীক্ষায় রেকর্ডের সত্যতা প্রমাণিত হয়। তার পরেও প্রশাসন তিনজনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়।

শ্বশুরকে ইমেরিটাস অধ্যাপক

উপাচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায়, ২০২৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর ৫৩৫তম সিন্ডিকেট সভায় নিজের শ্বশুর, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতা ড. এ কে এম আজহারুল ইসলামকে ইমেরিটাস অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেন অধ্যাপক নকীব।

এই নিয়োগ নিয়ে তখন থেকেই তীব্র সমালোচনা চলছে।

অ্যাডহক নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরে অনুসন্ধান কাম তথ্য কর্মকর্তা পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ‘পৃষ্ঠপোষক’ রাশেদুল ইসলাম ওরফে রাশেদ রাজনকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই গত বছরের ৩রা মার্চ অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

রাশেদুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ থেকে স্নাতকে ২.৭৭৮ এবং স্নাতকোত্তরে ৩.০৭ পেয়েছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “জরুরি প্রয়োজনে ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে নিয়োগের যে বিধান রয়েছে, সেটিকে বিগত প্রশাসন কাজে লাগিয়ে সম্পূর্ণ দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিয়েছে।”

মেডিক্যাল সেন্টারেও কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ছয়জন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের অধিকাংশই জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত এবং আগে ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কর্মচারী নিয়োগেও একই ছবি

নকীব প্রশাসন দৈনিক ৭৫০ টাকা মজুরির ভিত্তিতে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৩১৫ জন কর্মচারী নিয়োগ দেয়। জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণের কথা বলা হলেও বাস্তবে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কে কী বলছেন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “নিয়োগ বাণিজ্য করে সালেহ হাসান নকীব অন্তত শতকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রশাসন ভবনকে তিনি ‘নিয়োগের কারখানা’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।”

ফার্মাসি বিভাগের অধ্যাপক মামুনুর রশিদ বলেন, “১৫৪ জন শিক্ষকের মধ্যে বিএনপিপন্থী বা নিরপেক্ষ শিক্ষকদের সংখ্যা একেবারেই কম, ১০ শতাংশও হবে না।”

রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার অবশ্য শুধু সাবেক উপাচার্যকে দায়ী না করে বর্তমান উপ-উপাচার্যের দিকেও প্রশ্ন ছুঁড়েছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান উপ-উপাচার্য মাঈনউদ্দিন স্যার তার গ্রামের বাড়ি ফেনী থেকে লোক এনে চাকরি দিয়েছেন। তাদের যোগ্যতা কী?”

সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি। কোথাও কোনো দুর্নীতি ও সুপারিশকে প্রশ্রয় দিইনি।” তবে শ্বশুরকে ইমেরিটাস পদে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো জবাব না দিয়ে ফোন কেটে দেন।

বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম স্বীকার করেন যে অনেক নিয়োগে নিয়মনীতি মানা হয়নি। তিনি বলেন, “কিছু কিছু নিয়োগে কোনো রকম নিয়মনীতি মানা হয়নি। রেজিস্ট্রারকে এড়িয়ে ভিসি, প্রো-ভিসি সরাসরি অনেক নিয়োগ দিয়েছেন। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রেক্ষাপট

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নিয়োগ কাণ্ডে আগে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান। তিনি প্রথম মেয়াদের চার বছরে ৫৯৫ জন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে আরও ২৪৩ জনকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সেই নজির এখন ম্লান হয়ে গেছে — মাত্র ৫৫৭ দিনে ৪৭৮ জন নিয়োগের রেকর্ড গড়েছেন অধ্যাপক নকীব।

দুই স্বর্ণপদকজয়ী গবেষক থেকে শুরু করে শ্বশুর পর্যন্ত এই নিয়োগ তালিকার বিস্তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

Visited 11 times, 1 visit(s) today