মতামত || জনপ্রিয়তার লোভে রাষ্ট্রনেতাদের মিথ্যার রাজনীতি

মতামত || জনপ্রিয়তার লোভে রাষ্ট্রনেতাদের মিথ্যার রাজনীতি
শেয়ার করুন

ইব্রাহিম খলিল সবাক


বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করার পর এর প্রচারণার জন্য একটা ছোট বই প্রকাশের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এই প্রয়োজনে যুক্ত ছিলেন চারজন—বঙ্গবন্ধু, আবুল মনসুর আহমদ, মানিক মিয়া আর তাজউদ্দীন আহমদ। বইয়ে কী থাকবে না থাকবে, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর বই লেখার দায়িত্ব পড়ল আবুল মনসুর আহমদের ওপর। আবুল মনসুর আহমদ বললেন, বইটি প্রকাশিত হবে বঙ্গবন্ধুর নামে। কিন্তু এই প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধু রাজি নন। তিনি বললেন, বই যিনি লিখবেন, তাঁর নামেই প্রকাশিত হবে। পরে তাঁকে এই বলে রাজি করানো হলো যে, বই যেই লিখুক, মূল চিন্তা যাঁর, বই তাঁরই। কিন্তু তবুও তিনি দোনোমোনো করছিলেন। কারণ, লোকে যদি জানতে পারে বঙ্গবন্ধু অন্যের লেখা নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন, তাহলে তিনি মুখ দেখাবেন কী করে! আবুল মনসুর আহমদ আশ্বস্ত করলেন, বই কে লিখেছে এই তথ্য আর কেউ জানবে না।

বই প্রকাশের দুই-তিন দিন পর আবুল মনসুর আহমদ জানতে পারলেন, বইটি যে তাঁর লেখা, এটা পার্টির লোকজন জেনে গেছে। তিনি তো ভয়ে শেষ! বঙ্গবন্ধু যদি এ কথা জানতে পারেন, তাহলে একটা ঝামেলা হয়ে যাবে। আবুল মনসুর আহমদ আর মানিক মিয়া নিশ্চিত ছিলেন, এই কাজ তাজউদ্দীন করেছেন। ছোট মানুষ, গোপন কথা পেটের ভেতর ধরে রাখতে পারে না। তাঁরা দুজন মিলে তাজউদ্দীনকে অনেক বকাবকি করলেন। পরে জানা গেল, তাজউদ্দীন নন, বঙ্গবন্ধু নিজেই লোকজনকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, বইটি তাঁর লেখা নয়।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর সময়কার রাজনীতিবিদদের অভিজ্ঞতা ছিল এরকমই—তাঁদের বলা গল্পগুলো ছিল বঙ্গবন্ধুর সততা, পরিশ্রম, ত্যাগ, বুদ্ধিমত্তা আর সাহসের।

শেরে বাংলাকে নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত গল্পও ছিল এমনই। তাঁর ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব আর জনগণের প্রতি পিতৃসুলভ আচরণের কথাই শোনা যায়।

এক্ষেত্রে মাওলানা ভাসানী আবার ভিন্ন। তিনি ছিলেন বেশ নাটুকে। সোজা কাজটি সোজা কায়দায় না করে তিনি সেটিকে বিরাট আয়োজনে রূপান্তরিত করতেন। যেমন, একবার মরিচের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে গরিব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। মানুষ মরিচ খাওয়া ছেড়েই দেয়। তেমনই এক সময় মাওলানা ভাসানী গেলেন যমুনার চরের এক নির্জন গ্রামে। তিনি যেখানেই যেতেন, তাঁর দোয়া নেয়ার জন্য লোকজন ভিড় করত; সেদিনও করল। তবে সেদিন শুধু দোয়া নয়, তাঁর কাছে ঝালহীন তরকারি খাওয়া নিয়ে নালিশও ছিল। তারা চেয়েছিল, হুজুর যেন তাঁর কেরামতি দেখিয়ে আকাশ থেকে মরিচ নামিয়ে আনেন।

হুজুরের আবার হুটহাট মোনাজাত ধরার বাতিক ছিল। সবাইকে নিয়ে মোনাজাত ধরলেন। আল্লাহর কাছে মরিচের জন্য প্রার্থনা করলেন। প্রার্থনা শেষে বললেন, চলো ঘাটে যাই, মরিচ এসেছে কিনা দেখে আসি।

গ্রামের লোকজন ঘাটে গিয়ে দেখে, সেখানে একটা মরিচবোঝাই নৌকা পড়ে আছে। না, নৌকাটি আকাশ থেকে পড়েনি, ফেরেশতা বা হুজুরের জ্বিন এসে রেখে যায়নি; হুজুর এই চরে আসার কিছুক্ষণ পর তাঁর লোকজনই নৌকাটি রেখে যায়।

হুজুর এসব নাটক করতেন মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য, নিজে আনন্দ পাওয়ার জন্য। যদিও আনন্দ পেতে পেতে লোকজন ভাসানী হুজুরকে নিয়ে অনেক অলৌকিক গল্প ফেঁদে বসত, এবং মানুষ বিশ্বাস করত, হুজুরের পোষা জ্বিন আছে, তারা হুজুরের জন্য কাজ করে।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই দেশ থেকে রাজনীতিরও মৃত্যু হয়, মৃত্যু হয় ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বেরও। জনপ্রিয়তা জিনিসটা কেবল নিজ দলের নেতাকর্মীদের মাঝে সীমিত হয়ে পড়ে; প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা জাস্টিফাই করতে গিয়ে যে পরিমাণ ঘৃণার চাষাবাদ করতে হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘৃণার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়েছে।

কিন্তু এই ঘৃণার মাঝেও নেতাদেরকে জনপ্রিয় হতে হবে, বলতে হবে অমুকের পর তমুকের জানাজায় সবচেয়ে বেশি মানুষ হয়েছে, কিংবা অমুকের পর তমুকই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে—ইত্যাদি।

খন্দকার মোশতাকের মতো নেতারও জনপ্রিয় হওয়ার শখ জেগেছিল। কিন্তু সেটা ছিল অসম্ভব। তাই তিনি আশ্রয় নিলেন কপটতার। আর এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঢালাওভাবে যুক্ত হলো জনপ্রিয় হওয়ার জন্য মিথ্যা গল্প প্রচারের সংস্কৃতি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল শুক্রবারে। সেদিনই ক্ষমতা নিলেন খন্দকার মোশতাক। সারাদিন রেডিও আর টিভিতে প্রচারিত হলো, খন্দকার মোশতাক বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ পড়বেন। পরদিন পত্রিকায়ও এই খবর বিশেষভাবে প্রচারিত হলো। তারপর তিনি চাইলেন, তাঁর গায়ের কোট বা আসকানটি জাতীয় পোশাক হোক, তাঁর মাথার টুপিটি হোক জাতীয় টুপি—যেন মানুষ জিন্নাহর টুপির মতো তাঁর টুপিকেও একটা সম্মানের জায়গায় রাখে। মন্ত্রিসভার কেউ কেউ এটা মানতেও শুরু করেন।

তারপর দেখা গেল, হঠাৎ করে ব্যবসায়ী সমাজ মোশতাকের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে নিয়মিত মিলাদ পড়াচ্ছে, কোরআন খতম করাচ্ছে। এগুলো আবার পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। মোট ৮৩ দিন ক্ষমতায় ছিলেন, এর মধ্যে মিথ্যা জনপ্রিয়তা উপভোগের কম চেষ্টা করেননি।

মোশতাকের অপসারণের পর জিয়াউর রহমান এই ধারা বজায় রাখেন। জিয়ার লোকজন তাঁকে নিয়ে মিথ্যা গল্প বানিয়ে বাজারে ছাড়ত। লোকমুখে সেসব গল্প ভেসে বেড়াত। অবশ্য লোকজন নিজে থেকেও বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলত। ছোটবেলায় আমার বড় মামার কাছে জিয়াকে নিয়ে সেরকমই এক গল্প শুনেছিলাম।

ভাসানীর মৃত্যুর পর তাঁর একনিষ্ঠ শিষ্য মশিউর রহমান যাদু মিয়া প্রেসিডেন্ট জিয়াকে পরামর্শ দিলেন দেশময় হেঁটে বেড়াতে; হাঁটলে নাকি খুব নাম হয়। তো, মিস্টার প্রেসিডেন্ট হাঁটতে হাঁটতে একদিন নোয়াখালীর এক গ্রামে গিয়ে হাজির হন। গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এক গরিব গৃহস্থের বাড়িতে যান এবং ডাবের পানি খেতে চান। গৃহস্থ বলল, তার বাড়িতে নারিকেলগাছ নেই, পাশের বাড়ি থেকে ডাবের পানি চেয়ে আনতে হবে।

একথা শুনে প্রেসিডেন্ট খুব আহত হলেন। তীব্র দুঃখবোধ থেকে তিনি একটি নারিকেলের চারার ব্যবস্থা করে সেটি রোপণ করেন। তারপর গাছের গোড়ায় পানি দেন; চারা গাছটি যেন ছাগলে খেয়ে না ফেলে, সেজন্য নিজ হাতে বেড়াও দেন।

নারিকেলগাছ রোপণ কর্মসূচি শেষে প্রেসিডেন্ট বললেন, এই গাছে যখন ডাব ধরবে, তখন তিনি আবার আসবেন এবং ডাবের পানি খেয়ে যাবেন। গল্পে আছে, প্রেসিডেন্ট জিয়া পরে সত্যিই ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন এবং ডাবের পানিও খেয়েছিলেন।

এখন কথা হলো, জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় ছিলেন চার বছর; একটা দেশি নারিকেলগাছে ডাব ধরতে লাগে পাঁচ থেকে সাত বছর। তাহলে জিয়াউর রহমান এই ডাব কখন খেলেন? মৃত্যুর পর? আর, একেবারে খুঁজে খুঁজে যে বাড়িতে নারিকেলগাছ নেই, সেই বাড়িতেই কেন ডাব খেতে গেলেন তিনি?

বানোয়াট গল্প তৈরিতে এরশাদ ছিলেন এক্সপার্ট। জনসম্মুখে তাঁর সবকিছুই ছিল বানোয়াট এবং নাটুকে। কিছুদূরে ডাঙা থাকা সত্ত্বেও কোমর পরিমাণ পানিতে নেমে ত্রাণ দেয়া, একদিন মধ্যরাতে ছদ্মবেশে শহর দেখতে বেরিয়ে সেই খবর লিক করে নিজের একটা খলিফা সালাহউদ্দিন টাইপ ইমেজ তৈরির চেষ্টা, মাত্র একদিন সাইকেল চালিয়ে অফিস করে দিনের পর দিন সেটা পেপার-টিভিতে প্রচার করা, অন্যকে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নিজের নামে চালানোসহ অসংখ্য শয়তানি এরশাদ করেছেন।

তিনি সাধারণ কোনো মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে যেতেন, গিয়ে বলতেন, স্বপ্নে দেখেছিলেন এই মসজিদে জুমার নামাজ পড়ছেন, তাই আল্লাহর হুকুমে নামাজ পড়তে চলে এলেন। অথচ এর আগের দুই-তিন সপ্তাহ ধরে এই এলাকায় গোয়েন্দারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই এরশাদ নামাজ পড়তে গিয়েছেন, তার আগে নয়।

শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়ার কথা ভিন্ন। রাজনৈতিক উত্থানে উত্তরাধিকার কিছুটা ভূমিকা রাখলেও তাঁদেরকে রাজপথে সংগ্রাম করতে হয়েছে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তীব্র প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে লড়াই করতে হয়েছে। শেখ হাসিনাকে তো উনিশবার মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে। খালেদা জিয়াকে দীর্ঘদিন জেল খাটতে হয়েছে। তাই তাঁদেরকে বানোয়াট গল্পের ওপর নির্ভর করতে হয়নি। লড়াই এবং ত্যাগই তাঁদেরকে জনপ্রিয় করেছে। জনপ্রিয়তা নিয়ে মিথ্যাচার কিছু করে থাকলেও সেটা আসলে উৎসাহী কর্মী সমর্থকরা করেছে।

সর্বশেষ এই দেশে আমরা জনপ্রিয়তার জন্য নিকৃষ্টতম লোভ দেখেছি ড. ইউনূসের চোখেমুখে। একটা হাফ নোবেল আর বিদেশি লবিংয়ের ওপর ভর করে তিনি চেয়েছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হতে। আমাদের ‘জনপ্রিয় মুক্তিযোদ্ধা’ ফজলু কাকা তো ইউনূসকে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মুসলমান’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, যদিও পরে তা আবার ফিরিয়ে নেন। যা হোক, ইউনূসের কোনো কিছুই কাজে লাগেনি। বিএনপির নিষ্ক্রিয়তা এবং আওয়ামী লীগের বেকায়দা পরিস্থিতির সুযোগে তিনি দেড় বছর ক্ষমতায় ছিলেন জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই।

এরপর এলেন তারেক রহমান। মাস দুয়েক আগে ক্ষমতা পেয়েছেন। এই দুই মাসে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য বহু নাটক করলেন। কিন্তু কোনোটিই কাজে দিচ্ছে না। ভিআইপি প্রটোকল না নেয়ার নাটক, মাত্র এক ঘণ্টায় অপহৃত যুবককে উদ্ধারের নাটক, খাল কাটা কর্মসূচির নাটকসহ বিভিন্ন প্রকারের কার্ডের নাটক চলছে। তাঁর মেয়ে স্কুলে থাকতে ফুটবল খেলত—সেটার সঙ্গে কোনো ব্রিটিশ ক্লাবকে জড়িয়ে ছড়ানো হয়েছে বানোয়াট গল্প।

আর তিনি নিজে বিভিন্ন মিথ্যা আর বেফাঁস কথা বলেই যাচ্ছেন। ১৯৭৬ সালে মারা যাওয়া ভাসানী নাকি ১৯৭৯ সালে জিয়ার হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়েছিলেন! এই কথা জনসমক্ষে বলেছেন তারেক রহমান, তাও আবার একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। পরবর্তীতে এই কথা উইথড্র করেছেন কি না, কিংবা ক্ষমা চেয়েছেন কি না, জানি না। তবে ক্ষমা চাওয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না।

তাঁর পিতা জিয়াউর রহমান, আদর্শিক আত্মীয় মোশতাক, এরশাদ আর ইউনূস যা করেছেন, তারেকও তাই করবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মিথ্যা জনপ্রিয়তার দৌড়ে তারেক রহমান এখন পর্যন্ত নিজস্ব কোনো সৃজনশীলতা দেখাতে পারেননি। তাঁর পিআর টিম একসাথে অনেক কিছু কপি-পেস্ট করার চেষ্টা করছে, এবং লাগাতার ব্যর্থ হচ্ছে।

অথচ তারেক রহমান চাইলেই বঙ্গবন্ধু, ভাসানী, শেরে বাংলাকে অনুসরণ করতে পারতেন। তাঁদের মতো বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন পাওয়া তাঁর পক্ষে আর সম্ভব নয়, কিন্তু মিথ্যা জনপ্রিয়তার পেছনে না দৌড়ে গঠনমূলক রাজনীতি করার পথে পা বাড়াতে পারতেন। আর এতে করে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়ত আওয়ামী লীগ। তাদের অনুপস্থিতিতে তারেক এতটাই জনপ্রিয় হতে পারতেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা নতুন ডাইমেনশন এনে দিতে পারত।

লেখক পরিচিতি: ব্লগার, কলামিস্ট

Visited 17 times, 1 visit(s) today