মতামত।। এখনো আস্থার সংকটে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কঃ কূটনীতির আড়ালে দ্বৈত রাজনীতির প্রশ্ন

মতামত।। এখনো আস্থার সংকটে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কঃ কূটনীতির আড়ালে দ্বৈত রাজনীতির প্রশ্ন
শেয়ার করুন

– মৃণ্ময় সেন

 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের ৭–৯ এপ্রিলের ভারত সফরকে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সৌজন্য, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং সম্পর্ক উন্নয়নের ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু এই সফরের প্রকৃত তাৎপর্য লুকিয়ে আছে আরও গভীর এক প্রশ্নে—ভারত কি এমন একটি বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারকে বিশ্বাস করতে পারে, যে একদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সহযোগিতার কথা বলছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সন্দেহ, বৈরিতা ও দ্বৈত নীতি লালন করছে? মূল গল্পটি এখানেই—প্রোটোকল বা দৃশ্যমান সৌজন্যে নয়, বরং বিশ্বাসের সংকটে।

 

ভারতের ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতি দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নীতি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগের কারণে। কিন্তু এই নীতির আসল শক্তি স্লোগানে নয়, বরং ধৈর্যে। ঢাকায় যখনই ভারতবিরোধী বক্তব্য রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, দিল্লি তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সংযমের পথই বেছে নিয়েছে।

 

বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের সময় এই সংযম ছিল অত্যন্ত লক্ষণীয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার আগেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। তার আশপাশে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে উঠেছিল, যেখানে ভারতকে উসকে দেওয়া যেন একধরনের রাজনৈতিক ফ্যাশনে পরিণত হয়। ঢাকায় এমন স্লোগানও শোনা গেছে, যেখানে দিল্লিকে সরাসরি শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ অঞ্চল ভেঙে দেওয়ার মতো কল্পনাও প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয়েছে। চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, এবং ভারতবিরোধী মনোভাবকে পরিকল্পিতভাবে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

 

তবুও ভারত সম্পর্ক ছিন্ন করার পথ নেয়নি। নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে ভিসা কার্যক্রম সীমিত করা, কূটনীতিকদের পরিবার সরিয়ে নেওয়া কিংবা ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা স্থগিত করা হলেও, জরুরি পণ্য সরবরাহ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এমনকি দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাঠানো এবং আঞ্চলিক সম্মেলনের পার্শ্ব বৈঠকে শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগ বজায় রাখা—এসবই ইঙ্গিত দেয় যে ভারত সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে দিতে চায়নি।

 

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ফেরার পরও ভারত একই মনোভাব বজায় রেখেছে। শোক প্রকাশ, উচ্চপর্যায়ের সফর এবং জ্বালানি সহায়তা অব্যাহত রাখা—এসব পদক্ষেপ নিছক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আস্থা পুনর্গঠনের সচেতন প্রয়াস। এই প্রেক্ষাপটেই খলিলুর রহমানের সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

এই সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং জ্বালানি মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকগুলো ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক নয়—বরং গভীর বার্তাবাহী। প্রকাশ্য বিবৃতিতে সহযোগিতা ও পারস্পরিক স্বার্থের কথা বলা হলেও, প্রকৃত আলোচনা হয়েছে আড়ালে। স্পষ্টতই, দিল্লি এই সফরকে ‘নতুন সূচনা’ নয়, বরং ‘উদ্দেশ্যের পরীক্ষা’ হিসেবে দেখেছে।ভারতের উদ্বেগ তিনটি মূল ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত—নিরাপত্তা, কৌশলগত অবস্থান এবং গণতান্ত্রিক আচরণ। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা এবং চীনের সঙ্গে সামরিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা দিল্লির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানি সামরিক ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি, সম্ভাব্য অস্ত্র সহযোগিতা কিংবা চীনের সহায়তায় কৌশলগত স্থাপনা উন্নয়ন—এসব বিষয় ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

একইসঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। বিরোধী ও সংখ্যালঘু নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান এবং ধর্মীয় রক্ষণশীলতার প্রভাব বৃদ্ধি—এসবই ভারতের দৃষ্টিতে উদ্বেগজনক। কারণ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রায়শই সীমান্তের বাইরেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।

 

এখানেই বিএনপি সরকারের মূল দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তারা সংযত ও সহযোগিতামূলক ভাষা ব্যবহার করছে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক আচরণ সেই বার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নির্বাচনের আগে যে নীতির কথা বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে তার বিপরীত পদক্ষেপ নেওয়া—এই অসঙ্গতি বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করছে।ঐতিহাসিকভাবে এই দ্বৈত আচরণ নতুন নয়। কখনো কঠোর অবস্থান নিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন, আবার প্রয়োজনে সমঝোতার পথে হাঁটা—এই কৌশল দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির অংশ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই কৌশল আর কার্যকর নয়। কারণ এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।

 

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে কেবল কূটনৈতিক ভাষণ যথেষ্ট নয়। জ্বালানি নির্ভরতা, পানিবণ্টন চুক্তি, বাণিজ্যিক সংযোগ এবং নিরাপত্তা—সবকিছুই এই সম্পর্ককে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ ভারতকে এড়িয়ে যেতে পারে না, এবং ভারতও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করতে পারে না।এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন স্পষ্টতা ও নীতিগত সামঞ্জস্য। যদি বিএনপি সরকার সত্যিই সম্পর্ক উন্নত করতে চায়, তবে তাকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটাতে হবে। দ্বৈত ভাষা পরিহার করে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

অন্যথায় এর প্রভাব কেবল কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি—এসবের বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই।ভারত ইতিমধ্যে দরজা খোলা রেখেছে। এখন প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি সেই দরজায় আন্তরিকভাবে প্রবেশ করতে প্রস্তুত? এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি খুব আশাব্যঞ্জক নয়।

 

বিদেশে আস্থা চাওয়া এবং দেশে তা ক্ষয় করা—এই দ্বৈত নীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
আর যদি এই সুযোগ হারিয়ে যায়, তবে তার দায়ভার বর্তাবে সম্পূর্ণভাবে বিএনপি সরকারের ওপরই।

 

Visited 16 times, 1 visit(s) today