তোয়াক্কা না করায় ইউনূসকে পাঠানো চিঠি উন্মুক্ত: আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ও নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছিল জাতিসংঘ

তোয়াক্কা না করায় ইউনূসকে পাঠানো চিঠি উন্মুক্ত: আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ও নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছিল জাতিসংঘ
শেয়ার করুন

❐ সংবাদ প্রতিবেদন


অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জবাব না পেয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ২০২৫ সালের ২৯শে ডিসেম্বর পাঠানো আনুষ্ঠানিক চিঠিটি জনসম্মুখে প্রকাশ করে দিয়েছে সংস্থাটি। চিঠিতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অধিকার, সুষ্ঠু বিচার এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।

২০২৫ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেন বেন সল, ম্যাথিউ গিলেট এবং মার্গারেট স্যাটারথওয়েট। তারা বলেন, গৃহীত পদক্ষেপগুলো মতপ্রকাশ, সমাবেশ, সংগঠন এবং সুষ্ঠু বিচারের অধিকারকে “অপ্রয়োজনীয় ও অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে” সীমিত করতে পারে।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের ঘটনায় উদ্বেগ

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের মে মাসে আইনি সংশোধনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। শেখ হাসিনাসহ দলটির নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশ-এ বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ, প্রকাশনা, গণমাধ্যমে প্রচার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও বাতিল করেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুতর পদক্ষেপ এবং তা কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই নেওয়া উচিত।

মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা

চিঠিতে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগের বক্তব্য প্রচার, বিশেষ করে শেখ হাসিনা-এর বক্তব্য প্রচারে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের “যেকোনো প্রচার” নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক বিতর্ককে দমন করতে পারে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এছাড়া, আওয়ামী লীগের সমর্থনে সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচনে একটি বড় দলকে বাইরে রাখা রাজনৈতিক বহুমতকে দুর্বল করতে পারে এবং ভোটারদের প্রকৃত পছন্দ থেকে বঞ্চিত করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।

গ্রেপ্তার ও বিচার নিয়ে প্রশ্ন

চিঠিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে গণগ্রেপ্তার, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের আটক, হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ এবং নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি, কিছু সহিংস ঘটনার ক্ষেত্রে দায়মুক্তির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এমন দায়মুক্তি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শেখ হাসিনা-এর বিচার নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, নিজের পছন্দের আইনজীবী না পাওয়া, পর্যাপ্ত সময় না পাওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক প্রভাব—এসব বিষয় সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করছে।

সরকারের কাছে ১০ প্রশ্ন

জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—কোন নির্দিষ্ট ঝুঁকির কারণে পুরো একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হলো, এই নিষেধাজ্ঞা কতদিন থাকবে, এবং সুষ্ঠু বিচার ও রাজনৈতিক বহুমত নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, সরকারের জবাব ৬০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে এসব সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চিঠি

বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। তবে পুরো একটি রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিলে তা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চিঠি শুধু একটি দলের বিষয় নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বহুমত, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

Visited 1,466 times, 1 visit(s) today