❐ বিশেষ প্রতিবেদক
নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের পর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রশাসনিক, শিক্ষা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে জামায়াতে ইসলামী-সংশ্লিষ্ট বা পন্থী ব্যক্তিদের অপসারণের ধারা অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এই প্রক্রিয়াকে ‘জামায়াতি প্রভাব অবমুক্তকরণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এগিয়ে নিচ্ছে।
সূত্রগুলোর মতে, ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া জামায়াতপন্থীদের সরিয়ে দেওয়ার এই অভিযান সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশ প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল
পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রায় সকল জামায়াতপন্থী অফিসারকে ইতিমধ্যে সরানো হয়েছে। বাকি যারা রয়ে গেছেন, তাদেরও আগামী সপ্তাহের মধ্যে অপসারণ করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এতে পুলিশ বাহিনীতে ‘নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব’ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য পরিবর্তন
একযোগে একাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জামায়াতপন্থী উপাচার্যদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোতে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট বা হিযবুত তাহরীরপন্থী উপাচার্যদের বিদায় করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুসারে, দেশের ৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কয়েকটিতে এখনও আলোচনা চলছে।
জেলা প্রশাসনে পরিবর্তন
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একাধিক জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ:
- গাজীপুর, পঞ্চগড়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া ও নেত্রকোণা জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে (১৫ মার্চ প্রজ্ঞাপন)।
- কুষ্টিয়ার ডিসি মো. ইকবাল হোসেনকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জামায়াত-শিবির সমর্থকদের আন্দোলন এবং বিএনপি সমর্থকদের পাল্টা বিক্ষোভ দেখা গেছে।
অভিযোগ উঠেছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে) সময়ে ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩২টিতে জামায়াতপন্থী ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
ফাঁস হওয়া কিছু নথিতে এদের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ ছিল, যা প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগকে জোরালো করেছে। নতুন সরকার এসে এই নিয়োগগুলোর অনেকগুলো বাতিল বা বদলি করেছে, যাতে স্থানীয় প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা যায়।
আর্থিক খাতে কঠোরতা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL)-এর বোর্ড থেকে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপসারণের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে জামায়াত কর্মসূচি পালনের চেষ্টা (ব্যাংক কর্মচারী নামে ইসলামী ব্যাংক দখল রাখার উদ্দেশ্যে) ব্যর্থ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংক থেকে জামায়াত কর্তৃক বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুসন্ধান শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোহাম্মদ মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংক আর কোনো নির্দিষ্ট গ্রুপ বা দলের প্রভাবে চলবে না।
২০২৪-এর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে) সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জামায়াত-সংশ্লিষ্টদের নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ছিল। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস জয়ের পর তারেক রহমানের সরকার গঠিত হয়েছে।
সরকারের এই পদক্ষেপকে অনেকে ‘প্রশাসনিক শুদ্ধি’ হিসেবে দেখছেন, আবার জামায়াতে ইসলামী এতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা দেখছে। দলটি অভিযোগ করেছে যে, নিয়োগে দলীয় পক্ষপাতিত্ব করা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এসব পদক্ষেপ দেশের প্রশাসন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার অংশ। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে বলে জানা গেছে।
