❐ ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক হলের ৪১৩ নম্বর কক্ষ থেকে বুধবার দুপুরে অরূপ রতন কনিস্ক নামে এক হিন্দু শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ৫০তম ব্যাচের এই শিক্ষার্থী নারায়ণগঞ্জ জেলার বাসিন্দা ছিলেন।
হল প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ২টার দিকে কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে সহপাঠীরা সন্দেহ প্রকাশ করলে প্রভোস্ট মো. নজরুল ইসলাম প্রান্তিক ঘটনাস্থলে যান এবং মরদেহ উদ্ধার করেন। পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যায়।
প্রাথমিকভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হবে।
সহপাঠীদের বরাতে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে অরূপ রতন বিভিন্ন ঘটনায় হতাশায় ভুগছিলেন এবং নীরব হয়ে পড়েছিলেন।
হিন্দু ও প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকায় গুপ্ত সন্ত্রাসী সংগঠন শিবির এবং বৈষম্যবিরোধী-জুলাই সমর্থক বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে তাকে নিয়মিত নিন্দা-মন্দ করা হতো বলে কয়েকজন সহপাঠী অভিযোগ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হিন্দু শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর ধারাবাহিক ঘটনা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ঘটনা বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হিন্দু শিক্ষার্থীদের মৃত্যু বা সন্দেহজনক মৃত্যুর একটি ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, হয়রানি ও মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে, যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা রয়েছে:
- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে হিন্দু শিক্ষার্থী আকাশ সরকারের মরদেহ একটি মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে আরেকটি ঘটনায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নদীতে ফেলে দেওয়া এক হিন্দু শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়, যা হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ উঠেছে।
- ২৯শে জানুয়ারি ২০২৬ সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলে উপমা দত্ত’র কক্ষ থেকে ওর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে।
- নওগাঁ জেলায় কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট: ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এক হিন্দু শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার পর নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে আরেক হিন্দু শিক্ষার্থীর সন্দেহজনক মৃত্যুর খবর আসে।
- অন্যান্য ঘটনা: ২০২৫-২০২৬ সালে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে (যেমন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়) ধর্মীয় অভিযোগে হামলা ও বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিভাগের এক শিক্ষককে হয়রানির ঘটনাও রিপোর্ট হয়েছে।
এসব ঘটনায় হিন্দু শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো দাবি করেছে যে, ২০২৪-এর পর থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বেড়েছে, যার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হিন্দু শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে হয়রানি ও মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে যে, ক্যাম্পাসগুলোতে সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। অরূপ রতন কনিস্কের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সহপাঠীরা শোকাহত এবং প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত দ্রুত তদন্ত করে সত্য উন্মোচন করা এবং ক্যাম্পাসে সকল শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন উঠবে, যা দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
