❐ নিজস্ব সংবাদদাতা
পাবনা সদর উপজেলায় জামায়াতের রুকনের মালিকানাধীন তেলের অবৈধ পাম্পে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুদের সন্ধান পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
এ ঘটনায় পাম্প কর্তৃপক্ষকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হলেও শাস্তির পরিমাণকে ‘আইওয়াশ’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
আজ ৭ই মার্চ, শনিবার বিকেলে সদর উপজেলার হেমায়েতপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আলীমের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে তেল মজুদের দায়ে জরিমানা করা হয়।
অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলম ওরফে আলম হাজী পাবনা জেলা জামায়াতের রুকন এবং হেমায়েতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
স্থানীয়রা জানান, যথাযথ লাইসেন্স ও অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে ওই পাম্পে তেল সংরক্ষণ ও বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।
জান্নাতের টিকেট ব্যবসায়ী খ্যাত জামায়াতে ইসলামীর নেতারা নিজেদের ‘সৎ লোক’ আখ্যায় ধর্মের সবক দিলেও প্রায় প্রতিদিনই দেশের গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে দলটির নেতাদের নানা অপকর্মের ঘটনা। এ নিয়ে বিদ্রুপ করতে ছাড়েননি স্থানীয়রা।
রাজীব নামে যুবদলের এক কর্মী হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, ‘জান্নাতের রকেটের জ্বালানি হিসেবে আলম হাজির পাম্পে মজুদ করা হয়েছিল এই তেল, আপনারা মাঝখান দিয়ে অন্য কিছু মনে করবেন না।’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইসলামপুর গ্রামের জামে মসজিদ সংলগ্ন একটি বড় ট্যাংকে গোপনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুদ করে রাখা হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নজরদারি এড়িয়ে এসব তেল মজুদ ও বাণিজ্যের মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছিল।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)-এর গোপন তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার বিকেল তিনটার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আলীমের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট তেলের পাম্পে অভিযান শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী অভিযানে পাম্পটিতে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে প্লাস্টিকের ট্যাংকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল সংরক্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এসময় পেট্রোল মজুদ ও বিক্রির পক্ষে কোনো বৈধ অনুমোদনপত্র বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন পাম্প কর্তৃপক্ষ। ফলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পাম্পটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আলম হাজীর ভাই আব্দুল হান্নানকে কয়েকটি ধারায় মোট ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
তবে গুরুতর অপরাধের পরও কারাদণ্ড বা ফৌজদারি মামলা না দিয়ে শুধু জরিমানার মাধ্যমে দায় সারায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদন ছাড়াই জ্বালানি তেল মজুদ করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনত গুরুতর অপরাধ, যার জন্য আরও কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়ার পরও প্রশাসনের এমন নমনীয়তা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি নিয়মকানুন উপেক্ষা করে ওই পাম্পে অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন আলম হাজী।
স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, ২০২১ সালের নভেম্বরে ওই পাম্পে বিস্ফোরণের ঘটনায় দুই শ্রমিক দগ্ধ হয়ে মারা যান। সে সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নিয়ম না মেনে পাম্প পরিচালনার বিষয়টি সামনে এলে জাহাঙ্গীর আলম চাপে পড়েন।
তবে পরে প্রশাসনিক তদবিরের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে পুনরায় কার্যক্রম চালু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, বারবার অনিয়মের অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও অজ্ঞাত কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তুলনামূলক কম জরিমানা ও মৌখিক সতর্কতা দিয়েই বিষয়টি শেষ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল আলীম বলেন, “অবৈধ কার্যক্রমের প্রমাণ পাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক করার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে। পাম্পটি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অপরাধের পুনরাবৃত্তির বিষয়টি আগে জানা ছিল না। সংশোধন না হলে পরবর্তীতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম ওরফে আলম হাজী দাবি করেন, পাম্পটির দেখভাল করেন তার ছোট ভাই আব্দুল হান্নান।
তার দাবি, পাম্পের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।
