রাবিতে ‘জুলাই যোদ্ধা’ কোটায় নিয়োগ দিতে উপ-উপাচার্য’কে ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’র হুমকি

রাবিতে ‘জুলাই যোদ্ধা’ কোটায় নিয়োগ দিতে উপ-উপাচার্য’কে ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’র হুমকি
শেয়ার করুন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী পদে নিয়োগের দাবি জানিয়েছে ‘জুলাই-যোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া একটি সংগঠন ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’।

সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দীনের কার্যালয়ে গিয়ে ‘জুলাই-যোদ্ধা’দের নিয়োগ দিতে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সোমবারের সিন্ডিকেট সভাকে ঘিরে দিনভর ক্যাম্পাসে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’।

সকাল থেকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তারা ক্যাম্পাসেই অবস্থান করছিলেন।

সংগঠনটির দাবি, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ‘জুলাই-যোদ্ধা’ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে সোমবার সন্ধ্যায় রাবির ৫৪৬তম সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাটি ঘিরে গত কয়েক দিন ধরেই নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনের পর বর্তমান প্রশাসনের অনেকেই দায়িত্ব ছেড়ে দিতে পারেন- এমন ধারণা থেকে এই সিন্ডিকেট সভাটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তাদের ভাষ্য, এই সভায় জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের নিয়োগ দিতে প্রশাসনের ওপর চাপও তৈরি হয়ল। তবে প্রশাসন এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।

এর মধ্যে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের দাবিতে সকাল থেকে ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’র ৬০ থেকে ৭০ জন নেতা-কর্মী ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন। তারা বেলা ১১টার দিকে উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে উপাচার্য ব্যস্ত থাকায় দেখা হয়নি। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও সাক্ষাৎ পাননি তারা।

দুপুরের দিকে সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা কোনো অনুমতি ছাড়াই উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এ সময় প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান সেখানে গিয়ে এভাবে উপাচার্যের কক্ষে প্রবেশের বিষয়ে আপত্তি জানান।

তিনি বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ নথি হারানোর ঝুঁকি ছিল এবং এভাবে প্রবেশ করা অনুচিত।”

ঘটনার সময় প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সাজিদ হোসেন ভিডিও ধারণ করলে প্রক্টর চলে যাওয়ার পর সংগঠনটির কয়েকজন নেতা-কর্মী তাকে ঘিরে ধরেন। তারা ভিডিও মুছে ফেলার জন্য চাপ দেন এবং তার পরিচয় জানতে চান। একপর্যায়ে সাজিদ হোসেন প্রক্টরকে ফোন দিলে সংগঠনটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর ওই সাংবাদিককে ছেড়ে দেওয়া হলেও তার ফোন নম্বর, বিভাগ ও পরিচয়পত্র যাচাই করা হয়।

অবস্থান কর্মসূচিতে ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’র আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে যারা সক্রিয় ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। প্রশাসন আগে আশ্বাস দিলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। মজুরিভিত্তিক নিয়োগেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের উপেক্ষা করা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের আত্মীয়-স্বজন নিয়োগ পেয়েছেন। মামলাভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উপেক্ষিত রয়েছে।”

সাংবাদিকের ভিডিও মুছে ফেলতে চাপ প্রয়োগের বিষয়ে মোস্তাফিজ বলেন, “অনেকে তাকে সাংবাদিক হিসেবে চিনতে পারেননি। সে কারণে ভিডিও ডিলিট করতে বলা হয়েছিল। কেননা সেখানে নিউজ করার মতো কিছু ঘটেনি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মাঈন উদ্দীন বিষয়টিকে হুমকি হিসেবে দেখছেন না জানিয়ে বলেন, “আজকের সিন্ডিকেটে নিয়োগসংক্রান্ত কোনো আলোচ্যসূচি নেই এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকেও এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কয়েকশ মানুষের চাকরি হচ্ছে- এমন গুজব আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সে কারণেই অনেকে নিশ্চিত হতে ক্যাম্পাসে এসেছেন। তবে তাদের কারণে কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না।”

এদিকে নির্বাচনের আগে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ বন্ধে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছেন বিএনপিপন্থি শিক্ষকরা।

জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, জিয়া পরিষদ ও ইউট্যাব-এর পাঠানো চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তারা এই নিয়োগ বন্ধে ইউজিসির হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, “নির্বাচনের আগে এ ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে আমরা বারবার উপাচার্যকে বলেছি। বিষয়টি আজ ইউজিসিকে জানানো হয়েছে।”

এর আগেও গত বছর ১৭ জুলাই রাবির তিন কর্মকর্তাকে ‘আওয়ামীপন্থি’ দাবি করে কর্মস্থল থেকে তুলে নিয়ে পুলিশে দিয়েছিল সংগঠনটি।

পরে চলতি বছর আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পরে নির্বাচন পর্যন্ত রাবিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত চেয়ে আবেদন করেন বিএনপিপন্থি পাঁচ কর্মচারী। পরে ৮ জানুয়ারি আবেদনকারী ওই পাঁচ কর্মচারীর কর্মস্থলে দলবেঁধে উপস্থিত হয়ে হুমকি, বাকবিতণ্ডা এবং একজনের গায়ে হাত তোলার অভিযোগও উঠেছিল সংগঠনটির বিরুদ্ধে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today