বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদসহ সুব্রত বাইনের সহযোগী শীর্ষ সন্ত্রাসী বিপু গ্রেপ্তার

বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদসহ সুব্রত বাইনের সহযোগী শীর্ষ সন্ত্রাসী বিপু গ্রেপ্তার
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


রাজধানীর উত্তর বাড্ডার পোস্ট অফিস পাড়ায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশি ও বিদেশি অস্ত্র এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী।

অভিযানে মেহেদী হাসান বিপু নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। অভিযানে তার বাসা থেকে ১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৩৯৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাড্ডার সাইদ নামে আরও একজনের সঙ্গে বিপুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিপুর বিরুদ্ধে বাড্ডা, গুলশান ও বারিধারা এলাকায় চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া সন্ত্রাসী মেহেদি কলিন্স ও গোলাম মর্তুজা বাবু তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেও জানা গেছে।

উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো ভাড়ায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে একের পর এক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হচ্ছে। তপশিল ঘোষণার পর থেকে গত ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত অভিযানে ২০৪টি অস্ত্র এবং এক হাজার ৯৬৫টি গোলাবারুদ জব্দ করা হয়েছে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ২টার দিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে একটি যৌথ দল বাড্ডায় মেহেদী হাসান বিপুর বাসায় অভিযান চালায়।

সেখান থেকে ৭টি পিস্তল, ৩টি রিভলবার, ২টি এয়ারগান, ১টি রাইফেল, ২টি রাইফেল ম্যাগাজিন, ৮টি পিস্তল ম্যাগাজিন, ৩৯৪ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৩০টি কার্তুজ, ২ হাজারের বেশি এয়ারগান প্যালেট, ১টি দূরবিন, ৪টি পিস্তল গ্রিপ সাইট কভার, ৩টি চাইনিজ কুড়াল, ১টি বিদেশি ছুরি, ২টি ওয়াকিটকি সেট, ১টি ওয়াকিটকি ব্যাটারি ও চার্জারসহ একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়। অভিযানে বিপুকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাড্ডা থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) আজহারুল ইসলাম জানান, বিপুকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে এবং শনিবার তাকে আদালতে হাজির করা হবে।

আইএসপিআর আরও জানায়, আসন্ন নির্বাচনী পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে বিপু অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ গোপনে মজুত করে রেখেছিলেন।

বিপুর পরিচয়

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের পক্ষে রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, ভাটারা, বারিধারা ও গুলশান এলাকার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করতেন মেহেদী হাসান বিপু। তার ও তার সহযোগীদের কাছে আরও অস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

এসব অস্ত্র মূলত সুব্রত বাইন ও আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের মালিকানাধীন।

গত বছরের মে মাসে কুষ্টিয়া শহরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সুব্রত বাইনের হয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেন মেহেদী হাসান।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করে আসছিলেন।

সূত্র জানায়, সুব্রত বাইনের সহযোগী হিসেবে মেহেদী হাসান ছাড়াও ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ ওরফে বড় সাঈদ, গোলাম মর্তুজা বাবু ওরফে মধু বাবু, সোহেল ওরফে কান্নি সোহেল সক্রিয় ছিলেন।

গত এক বছরে এ চক্র একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের ২০শে মার্চ গুলশানের পুলিশ প্লাজার সামনে ইন্টারনেট ব্যবসায়ী সুমন হত্যাকাণ্ড অন্যতম। ওই ঘটনায় ওয়াসির মাহমুদ সাঈদ গ্রেপ্তার হলেও দুই মাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মেহেদী হাসানের সঙ্গে বাড্ডা ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. জাহাঙ্গীর আলম ও তার ভাই আলমগীরের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।

পুলিশ জানায়, গত বছরের ৫ই আগস্টের পর সুব্রত বাইন প্রকাশ্যে সক্রিয় হন এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। মেরুল বাড্ডার একটি মাছের আড়ত থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করতেন তিনি ও তার সহযোগীরা।

সুব্রত বাইন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওই আড়তের নিয়ন্ত্রণ নেন মেহেদী হাসান। এছাড়া গাড়ির শোরুম, তৈরি পোশাক কারখানা ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি এবং ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি।

এদিকে শুক্রবার সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় যৌথ অভিযানে সন্ত্রাসী পিচ্ছি মাসুম ও তার তিন সহযোগী—নাসির, রাজু ও নাঈম—কে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। অভিযানে ২টি পিস্তল, ১টি রিভলবার, ১টি ডামি পিস্তল, ৩ রাউন্ড গুলি, ৩টি ওয়াকিটকি, মাদকদ্রব্য ও নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়।

অন্যদিকে ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে বিদেশি অস্ত্রসহ তিনজন এবং শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়াতে পৃথক অভিযানে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে যশোরের বাঘারপাড়ায় যৌথ অভিযানে বিদেশি পিস্তল, গ্রেনেডসদৃশ বস্তু, বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে চলমান যৌথ অভিযানে গত ১৭ দিনে দেড় শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র ও ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।

হদিস নেই জুলাই যোদ্ধা কর্তৃক থানা লুটের অস্ত্র-গোলাবারুদের

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট থেকে পরবর্তী কয়েকদিন পর্যন্ত সারাদেশে ৫ শতাধিক থানা-ফাঁড়ি আক্রমণ করে জুলাই যোদ্ধারা। এতে অসংখ্য পুলিশ শহিদ হন। একইসাথে জুলাই যোদ্ধাদের লুটপাটের শিকার হয় থানাগুলোর অস্ত্রাগার। খোয়া যায় পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র এবং কয়েক লাখ গোলাবারুদসহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম। একইসাথে থানায় গচ্ছিত থাকা সাধারণ নাগরিকদের অস্ত্রও লুটে নিয়ে যান জুলাই যোদ্ধারা।

খোয়া যাওয়া অস্ত্রের মধ্যে চলতি বছরের ১লা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩১টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে ১১২টি চায়না রাইফেল, ৩১টি চায়না এসএমজি, ৩টি চায়না এলএমজি, ৪৫০টি পিস্তল ও ৩৯০টি বোর শটগান। এছাড়া প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার রাউন্ড গোলাবারুদেরও কোনো হদিস নেই।

Visited 5 times, 1 visit(s) today