চট্টগ্রামের ৯ বছর পুরনো এক গায়েবি হত্যা মামলায় আসামী হলেন ফেনীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মিন্টু

চট্টগ্রামের ৯ বছর পুরনো এক গায়েবি হত্যা মামলায় আসামী হলেন ফেনীর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মিন্টু
শেয়ার করুন

জেলা প্রতিনিধি


চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ৯ বছর আগের একটি হত্যা মামলায় নতুন করে গায়েবিভাবে আসামী হলেন দৈনিক কালবেলা পত্রিকার প্রতিনিধি সিনিয়র সাংবাদিক আবু ইউসুফ মিন্টু।

২০১৭ সালের ৩১শে জুলাই ওই মামলাটি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া আমলি আদালত খারিজ করে দিলেও গত ১৭ই ডিসেম্বর নিহতের খালাত ভাই পরিচয়ে কক্সবাজারে উখিয়ার জনৈক মো. জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে পুনরায় আদালতে মামলাটি দায়ের করেছেন।

মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ড. হাছান মাহমুদকে প্রধান আসামী করে ১০২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলায় ফেনীর সিনিয়র সাংবাদিক মিন্টুর নাম ৬৬ নস্বর ক্রমিকে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের বাইরে ফেনীর একজন সাংবাদিককে মামলায় উদ্দেশ্যমূলক গায়েবি আসামী করায় জেলায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

মিন্টু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।

গত ৭ই ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক আবু ইউসুফ মিন্টুর নাম ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য পরশুরাম থানার এসআই রাজীব ফোন করলে বিষয়টি জানাজানি হয়।

নিহত মো. আবদুল নবীকে যুবদলের কর্মী পরিচয়ে জাহাঙ্গীর আলমের দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত করা ড. হাছান মাহমুদ ছাড়াও অন্যরা রাঙ্গুনিয়া এলাকার বাসিন্দা। তাদের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কোন পদ-পদবি নেই।

জানা যায়, চিহ্নিত মামলাবাজ পরশুরামের কোলাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও দাগনভূঁইয়া উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দানাইকোট ইউনিয়ন ভূমি অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (পিয়ন) ঘুষ, দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ও চাকরির আড়ালে সীমান্ত থেকে মাদক সংগ্রহ করে পাচার ও ব্যবসা করার অভিযোগে অভিযুক্ত ডিসি অফিসের কর্মকর্তা পরিচয়ে সাফায়েত উল্যাহ মজুমদার চট্টগ্রামের অজ্ঞাত পরিচয়ধারী একজনের যোগসাজশে মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ওই মামলায় সাংবাদিক মিন্টুকে আসামী করিয়েছেন বলেও জানা গেছে।

এই গায়েবি মামলার ঘটনায় পরশুরামের কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও অপেশাদার সাংবাদিকসহ একটি চক্র জড়িত রয়েছে বলে জানা যায়। এতে ফেনীতে কর্মরত সাংবাদিকরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

পরশুরামের কোলাপাড়া গ্রামের শহিদ উল্যাহ মজুমদারের ছেলে চাকরির আড়ালে মাদক ব্যবসায়ী সাফায়েত উল্যাহ মজুমদার এসব সংঘবদ্ধ চক্রের সাথে কাজ করে এলাকার হতদরিদ্র অনেকের নিকট থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার ভয়ে কেউই মুখ খুলতে সাহস পায় না।

একই মামলায় আবুল কাশেম প্লুটো (৪৫)কে পারিবারিক ঘটনার জেরে আসামী করিয়েছেন। প্লুটো মজুমদার উক্ত সাফায়েত উল্ল্যার আপন শ্যালক বলেও জানা যায়। যদিও প্লুটো মজুমদার দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। এজাহারে তার নাম ৬৭ নম্বর ক্রমিকে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার এজাহারসূত্রে জানা যায়, গত ১৭ই ডিসেম্বর ২০২৫ সালে মৃত মো. আবদুল নবীকে যুবদলকর্মী দাবি করে তার খালাতো ভাই পরিচয়ে মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বাদী হয়ে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদকে প্রধান আসামি করে ১০২ জনের বিরুদ্ধে পুনরায় মামলা করেছেন।

চট্টগ্রাম চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এর রাঙ্গুনিয়া আমলি আদালতের বিচারক মামলাটি চট্টগ্রাম পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)কে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ প্রদান করেছেন।

মামলার এজাহারসূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এলাকায় মো. মুন্সি মিয়ার ছেলে মো. আবদুল নবীকে ২০১৬ সালের ২৩শে জুন অপহরণ করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। তার প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ২রা জুলাই চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়। পরদিন ২৪শে জুন এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

এরপর এই ঘটনায় নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীর বিরুদ্ধে রাঙ্গুনিয়া থানার একটি মামলা করেন। এরপর মামলাটি বিগত ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ তারিখে আদালত খারিজ করে নথিজাত করার আদেশ প্রদান করেন।

পরশুরাম থানার এসআই রাজীব জানান, গত ১৭ই ডিসেম্বর চট্টগ্রামে জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন। আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিলে পিবিআই পরশুরাম থানায় ইনকোয়ারি স্লিপ পাঠায়।

সাংবাদিক আবু ইউসুফ মিন্টু বলেন, পরশুরামের একটি চক্র বেশ কিছু দিন ধরে আমাকে মামলা দিয়ে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছিল। এর আগেও তারা একটি মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জেলার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক, ফেনীর জেলার বিএনপি নেতা শেখ ফরিদ বাহার, যুবদল নেতা নাসির খন্দকার ও জামায়াত নেতা লিয়াকত ভূইয়ার প্রতিবাদের কারণে সফল হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ফেনীর সাংবাদিকদের ভয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা রাঙ্গুনিয়ায় গিয়ে আমাকে গায়েবি মামলায় আসামী করে হয়রানি করছে।

তিনি বলেন, আমি জীবনে কখনো রাঙ্গুনিয়া যাইনি। তবুও তারা আমাকে মিথ্যা আসামী করে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। পরশুরামের দুই রাজনৈতিক নেতা ও অপেশাদার সাংবাদিকসহ একটি পেশাদার চক্র জড়িত এতে।

চট্টগ্রামের জজ কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জাহাঙ্গির হোসেন বলেন, এটি একটি জঘন্য ঘটনা। ঘটনার সাথে ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক এক সাংবাদিককে গায়েবি মামলায় আসামী করাও দণ্ডনীয় অপরাধ। ২০১৬ সালের হত্যা মামলাটি পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন শেষে ২০১৭ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর আদালতের বিচারক খারিজ করে দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী বাদীপক্ষ খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অসৎ উদ্দেশ্যে নিহতের পরিবারের নিকট আত্বীয় পরিচয়ে তথ্য গোপন করে পুনরায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রাঙ্গুনিয়ায় রাত ৩টার একটি ঘটনায় ৯ বছর পর ফেনীর এক সাংবাদিককে শত্রুতাবশত কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আসামী করা হয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তায় পিবিআইয়ের সুষ্ঠু তদন্তে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আমরা আশাবাদী।

Visited 5 times, 1 visit(s) today