তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা: অচেনা একজন
জুলাই ষড়যন্ত্রের ‘শহীদ গেজেট’ সমাচার এর সিরিজ পোষ্টগুলোতে দেখেছেন, তথাকথিত জুলাই শহীদ গেজেটের তালিকা দীর্ঘ করার জন্য এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে পুলিশের উপর হামলা, থানা-ফাঁড়ি-অস্ত্রাগার লুট ও অগ্নিসংযোগ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। কারাগার থেকে পালাতে গিয়ে, কারাগারে হামলা করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়ীঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট – অগ্নিসংযোগ করার সময় নিজেদের আগুনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। নিজের কাছে থাকা অস্ত্রের আত্মঘাতি গুলিতে, চাঁদাবাজী করতে গিয়ে গণপিটুনিতে, ধর্ষণের অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। এমনকি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে, কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, ছাত্র-জনতা নামধারী সন্ত্রাসী’দের মবের আক্রমনের শিকার হয়ে নিহতদেরও নাম আছে এই গেজেটে।
আরো আছে আন্দোলনকারী সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলায় নিহত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র সদস্য’দেরও নাম !!!
জ্বী, একজনের নাম গেজেট থেকে বাদ দেওয়ার পরেও এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩ জন পুলিশ সদস্যের নাম আছে এই শহীদ গেজেটে।
প্রথমে বলি মোহা
ম্মদ মোক্তাদির এর কথা, গেজেটের ১৬০ নাম্বার সিরিয়ালে থাকা মোক্তাদির টুরিস্ট পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) হিসেবে কর্মরত ছিলো। রাজধানী মাতুয়াইল এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতো এএসআই মোক্তাদির। ২০শে জুলাই (২০২
৪ইং) সকাল সাড়ে আটটার দিকে পুলিশের ইউনিফর্ম একটি শপিং ব্যাগে নিয়ে সাদা পোশাকে পল্টন ট্যুরিস্ট পুলিশ সদরদপ্তরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়।
পথিমধ্যে যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ পৌঁছালে বিক্ষোভকারী নামধারী জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী জঙ্গীরা মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশী চালায় এবং ব্যাগে থাকা পুলিশের ইউনিফর্ম দেখে তার উপরে হামলা চালায়। বিক্ষোভকারীরা তাকে নৃশংসভাবে লাঠি রড পাইপ দিয়ে পিটিয়ে এবং চাপাতি রামদা দিয়ে কুপিয়ে বিভ্ৎসভাবে হত্যা করে, তার মাথা হয়ে যায় তিনভাগ এবং চেহারা হয়ে যায় বিকৃত। এখানেই সন্ত্রাসীদের নৃশংসতা শেষ হয়নি; তাঁর দুই পায়ে রশি বেঁধে অমানবিকভাবে রায়েরবাগ ফুটওভার ব্রিজে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখে। পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা উদ্ধার করে।
এরপর বলি ট্রাফিক বিভাগের কন্সটেবল মোঃ শাহিদুল আলমের কথা, তথাকথিত শহীদ গেজেটের ৮১ নাম্বার সিরিয়ালে থাকা মোঃ শাহিদুল আলম ৫ই আগষ্ট (২০২৪ইং) সকালে উত্তরার জসীমউদ্দীন সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ দায়িত্ব ছিলো। ঘন্টাখানেক দায়িত্ব পালন করার পর উর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে জসীমউদ্দীন সড়ক থেকে উত্তরা পূর্ব থানার সামনে যায় শাহিদুল। প্রধানমন্ত্রী দেশত্যাগ করার পরে উত্তরা পূর্ব থানা ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের উপর দফায় দফায় সশস্ত্র হামলা চালায় আন্দোলনকারী নামের সশস্ত্র দুর্বৃত্ত’রা’রা। রাস্তায় ডিউটিরত ট্রাফিক কন্সটেবল মোঃ শাহিদুল আলমকে পেশাগত পোশাকে পেয়ে উম্মত্ত মবগোষ্ঠী তার উপরে হামলে পড়ে। তাকে রড লাঠি পাইপ দিয়ে পিটিয়ে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।
এরপর বলি, মোঃ মাসুদ পারভেজ ভূঁইয়া’র কথা। শহীদ গেজেটের ৪৫৬ নাম্বার সিরিয়ালে থাকা মোঃ মাসুদ পারভেজ ভূঁইয়া পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলায় পুলিশ পরিদর্শক হিসাবে কর্মরত ছিলো। তার পরিবার থাকতো ঢাকার বনশ্রীর ‘ই’ ব্লকে। ১৯শে জুলাই (২০২৪) ছুটির দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে পরোপকারী ও সজ্জন হিসাবে পরিচিত মাসুদ পারভেজ বাসা থেকে বের হয়। এসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামক ব্যানারে থাকা উম্মত্ত আন্দোলনকারী পক্ষের সন্ত্রাসীরা মাসুদ পারভেজকে পুলিশ সদস্য হিসাবে চিনতে পেরে তার উপরে লাঠি রড পাইপ দিয়ে পিটিয়ে এবং দা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে, ছিনিয়ে নেয় মানিব্যাগ এবং দুইটা মোবাইল ফোন। আহতাবস্থায় এক ভদ্রমহিলা তাকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে নিয়ে যান, সেখানে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১শে জুলাই (২০২৪ইং) সকাল ১১টার দিকে মাসুদ পারভেজ মারা যায়।
নিহত পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ ভূঁইয়ার স্ত্রী মেরিনা আক্তার বীণা বাদী হয়ে ২৩শে জুলাই (২০২৪) ঢাকা খিলগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
‘শহীদ গেজেট’ সমাচার এর সিরিজ প্রতিটা পোষ্টেই বলেছি তথাকথিত শহীদ গেজেট এর তালিকা দীর্ঘ করার জন্য সর্বোচ্চ রকম অপচেষ্টা করা হয়েছে।
জেনে অবাক হবেন যে, শহীদ গেজেটের সিরিয়াল নাম্বার ৬০৩ এবং ৭৭৭ এর ‘শহীদ’ মোঃ হাসিবুর রহমান (পিতা- দেলোয়ার হোসেন) আসলে একজনই !!! ৬০৩ নাম্বারের বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা দেয়া আছে ডি-৯৩, তালবাগ, সাভার ঢাকা এবং ৭৭৭ নাম্বারের বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা আছে গ্রাম- উত্তর কানাইপুর, ইউনিয়ন- আলিনগর, উপজেলা- কালকিনি, জেলা- মাদারীপুর। ২টি আলাদা সত্তা বোঝানোর জন্য ২টি ভিন্ন ঠিকানা কিংবা ২টি ভিন্ন মেডিকেল কেইস নাম্বার এর মতো নিহত হাসিবুরের ব্যক্তিগত পারিবারিক তথ্যও ভিন্ন ভিন্ন রকম প্রচার করা হয়েছে সব মিডিয়ায়। কোথাও লেখা হয়েছে হাসিবুর মাদ্রাসা ছাত্র, কোথাও লিখা হয়েছে দিনমজুর আবার কোথাও লিখা হয়েছে মোটর মেকানিক। কোথাও লিখেছে সে তার চাচা-চাচীর কাছে বড় হয়েছে, কোথাও লিখেছে দাদীর কাছে বড় হয়েছে !!!
৫ই আগষ্ট (২০২৪ইং) দুর্বৃত্ত’দের মিছিল থেকে লাঠিসোটা, ধারালো অস্ত্র, দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সাভার এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশের উপর হামলা চালানো হয়। আক্রান্ত পুলিশ সদস্যরা জীবনরক্ষার্থে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়লে সাভার থানার কাছে হাসিবুর রহমান গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। পরবর্তীতে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ই আগষ্ট মারা যায়।
এই ঘটনায় নিহত হাসিবুর এর চাচা ফুয়াদ হোসেন বাদী হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ ১,৫০৬ জনের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় ১৪ই ফেব্রুয়ারী (২০২৫ইং) একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।
এইভাবেই তথাকথিত জুলাই শহীদের তালিকা দীর্ঘ করা হয়েছে, এভাবেই সারা দেশে নির্মম হত্যাকান্ড চালিয়ে সেসব নির্মম হত্যার দায় চাপানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সরকার, প্রশাসন এবং আওয়ামী লীগ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলির উপর।
সাথেই থাকবেন, ভবিষ্যতে ‘জুলাই ষড়যন্ত্রের ‘শহীদ গেজেট’ সংক্রান্ত কোনো অসঙ্গতি পেলে অবশ্যই জানাবো …


