মতামত || ড. ইউনূসের দেশ বিক্রির খতিয়ান

মতামত || ড. ইউনূসের দেশ বিক্রির খতিয়ান
শেয়ার করুন
আমিনুল হক পলাশ

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এনডিএ চুক্তি স্বাক্ষর করে ২০২৫ সালের ১৩ জুন। ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক আরোপিত রিসিপ্রোকাল ট্যাক্স কমিয়ে আনার অজুহাতে তড়িঘড়ি করে যথাযথ স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা ছাড়াই এই চুক্তি করা হয়। নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট হওয়ায় স্বভাবতই এই চুক্তির বিষয়গুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার কোন সুযোগ ছিলো না।

সরকারের তরফ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে এই চুক্তিতে দেশের স্বার্থবিরোধী কোন কিছু নেই। যদিও স্বার্থবিরোধী কোন কিছু না থাকলে কেন তা জনগণকে জানানো হয়নি, সেই বিষয়ে কোন সদুত্তর তারা দিতে পারেনি। তবে পরবর্তীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হতে ফাঁস হওয়া চুক্তিটির খসড়া বিশ্বেষণে প্রমাণিত হয় সরকারের দাবি যে সর্বৈব মিথ্যা।

২০ পাতার এই এনডিএ চুক্তির প্রতিটি পরতে পরতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা, অর্থনীতি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বৈদিশিক সম্পর্কজনিত সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতাকে বিদেশী রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষরকালীন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিলো যে উক্ত চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং বিমান এবং গম কেনার কথা রয়েছে। তবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন আগষ্টে দাবি করেছিলেন, মার্কিন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার সময় তাদের বোয়িং বিমান বিক্রয়ের বিষয়ে সিরিয়াস মনে হয়নি। এদিকে বাংলাদেশে বিমানের পক্ষ থেকেও জানানো হয় বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে তারা অবগত নয়। অথচ এর মাত্র চারমাসের মাথায় গত ডিসেম্বর ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে বিমান।

৩০শে ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে বিমানের পরিচালনা পরিষদে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই ৩৭০০০ কোটি টাকা অর্থাৎ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল ক্রয়চুক্তি চূড়ান্তের লক্ষ্যে কাজ চলছে। এই চুক্তি সম্পাদের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার জন্য ২০২৫ এর ২৭শে আগস্ট বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিনকে বাংলাদেশে বিমানের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

পাশাপাশি গত ১৪ই জানুয়ারি নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালনরত ইউনূসের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বিমানের পরিচালনা পরিষদের সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়। এরা প্রত্যকেই ইউনূস ঘনিষ্ঠ হিসেবে সুপরিচিত। এছাড়া সামরিক বাহিনীর জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্তও চূড়ান্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ এর জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানির জন্য যুকরাষ্ট্রের গম রপ্তানিকারক সমিতির সাথে সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী আগামী ৫ বছর বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫ লক্ষ টন গম আমদানী করবে। চুক্তিতে প্রতি টন গমের মূল্য ধার্য্য করা হয়েছে ৩০৮ ডলার যা সময়ের সাথে সমন্বয় করার কথা উল্লেখ রয়েছে।

অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে টনপ্রতি ২২৬-২৩০ ডলারে গম পাওয়া যায়। ইতোমধ্যে এই চুক্তির আওতায় তিন দফায় মোট ২ লক্ষ ২০ হাজার টন গম আমদানী করা হয়েছে। উচ্চমূল্যে আমদানি করার ফলে বাংলাদেশে খোলা বাজারে আটার দাম বৃদ্ধি পাবে যার প্রভাব পড়বে খাদ্য পণ্যের দামে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে দেশের সাধারণ মানুষ।

অন্তর্বর্তী সরকার ১২ই আগষ্ট ২০২৫ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চার এলএলসি থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা দিয়ে এই দুটি জাহাজ ক্রয় করা হবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র জাহাজ উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিশ্বের প্রথম দশ দেশের তালিকাতেও নেই। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র থেকেই বাজারের মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে জাহাজ ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

মজার বিষয় হল, এই দুইটি জাহাজও চীনে তৈরি করা হবে। অর্থাৎ চীনের তৈরিকৃত জাহাজ চীন থেকে না কিনে উচ্চমূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জি থেকে আগামী ১৫ বছর প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা (সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের এলএনজি ক্রয়ের চুক্তি করেছে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের নভেম্বরে এক্সিলারেট এনার্জির সাথে প্রাথমিক চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ সরকার। এর আগে কাতারের সরকারি প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জির সাথে ২০১৭ সালে ও ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেডের সাথে সম্পাদিত দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির আওতায় প্রতিযোগিতামূলক দামে এলএনজি আমদানি করত সরকার।

মূলত প্রতিদ্বন্দীতা তৈরি করার জন্যই এক্সিলারেট এনার্জির সাথেও চুক্তি করেছিল সরকার যে চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করার কথা ছিলো প্রতিষ্ঠানটির। তবে ২০২৪ এর ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে তৎপরতা বৃদ্ধি করে এক্সিলারেট এনার্জি। সেপ্টেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের চাকরি ছেড়ে এক্সিলারেট এনার্জিতে স্ট্র্যাটেজিক এডভাইজর হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশের দায়িত্ব পালন করা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ডি হাস।

অক্টোবরে ড. ইউনূসের সাথে দেখা করতে বাংলাদেশে উড়ে আসেন এক্সিলারেট এনার্জির স্টিফেন কবোস। এরপরই মূলত বাংলাদেশে এলএনজি রপ্তানির একক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এক্সিলারেট এনার্জির হাতে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পুনঃচুক্তি অনুযায়ী এক্সিলারেট থেকে ক্রয়কৃত প্রতি এমএমবিটিউ ইউনিট গ্যাসের দাম ধরা ১৫.৬৯ ডলার, যা স্পট মার্কেটের চেয়ে অন্ততপক্ষে ২.৫ ডলার বেশি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ এর এপ্রিল মাসে স্পট মার্কেট থেকে বাংলাদেশে এলএনজি ক্রয় করেছিল ৯.৫- ৯.৯৩ ডলার দামে।

গত ৩০শে ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সকার ট্রেডিং এসএর কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদে এলএনজি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। প্রতিষ্ঠানটির দপ্তর সুইজ্যারল্যান্ডে অবস্থিত হলেও এটি মূলত আজারবাইজানের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি সকারের বাণিজ্যিক শাখা।

উল্লেখ্য, গত ৭ই ডিসেম্বর আজারবাইজানের প্রেসিডেন্টের দুই মেয়ে লায়লা আলিয়েভা ও আরজু আলিয়েভা বাংলাদেশে সফরে এসে ড. ইউনূসের সাথে সাক্ষাৎ করেন। মূলত ড. ইউনূসের হস্তক্ষেপেই বিতর্কিত সকার কোম্পানি থেকে এলএনজি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকেও অপ্রয়োজনীয় ও উচ্চাভিলাষী নানা উদ্যোগ গ্রহন করেছে সরকার। এর মাঝে রয়েছে পাকিস্তান থেকে জেএফ১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয়, ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম থেকে ইউরোফাইটার টাইফুন ক্রয়, চীনের সাথে জিটুজি চুক্তিতে ড্রোন কারখানা স্থাপন ও জে ১০ সিই যুদ্ধবিমান ক্রয়, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সাবমেরিন ক্রয়, তুরস্ক থেকে টি-১২৯ এটাক হেলিকপ্টার ক্রয় এবং জাপানের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর।

এর পাশাপাশি গত নভেম্বরে চট্টগ্রাম পতেঙ্গায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালের সাথে ৩৩ বছরের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের দায়িত্ব ৩০ বছরের জন্য তুলে দেয়া হচ্ছে আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডের হাতে।

ঢাকার অদূরে অবস্থিত পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে সুইজ্যারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির হাতে।

ড. ইউনূস বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা দখল করে একদিকে নিজের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেছেন, অপরদিকে তার নিয়োগকর্তাদের সন্তুষ্টি আদায়ের লক্ষ্যে একের পর এক দেশ ও রাষ্ট্র বিরোধী চুক্তি ও কার্য সম্পাদন করেছেন। এর ফলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হবে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হয়ে ভুক্তভোগী হবে সাধারণ জনগণ।

মূলত নিজের এ সকল অপকর্ম এবং দুর্নীতি থেকে দায়মুক্তি আদায়ের জন্যই তিনি গণভোট নামের নাটক এবং তাতে হ্যাঁ কে জয়যুক্ত করতে পরিকল্পনা করেছেন। এটাকেই তিনি বানাতে চাচ্ছেন তার রক্ষাকবচ। তাছাড়া সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এমন একটি শাসন কাঠামো তৈরি করতে যাচ্ছেন যাতে করে কোন রাজনৈতিক সরকারের পক্ষেই ইউনূসের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোকে পরিবর্তনা করা না যায়।

পশ্চিমা পরাশক্তিরা এতে প্রকাশ্যেই সম্মতি জানাচ্ছে কেননা এর ফলে বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ নিশ্চিত হবে। ড. ইউনূস যে উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা দখল করেছিলেন তা তিনি পুরোপুরিই বাস্তবায়ন করেছেন, ১২ তারিখের সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে এখানে শেষ সীলমোহর দিবেন।

পরিচিতি: সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Visited 425 times, 1 visit(s) today