নিজস্ব প্রতিবেদক
গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রীয় পদধারীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রকাশ্য প্রচার আইনবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার চালানো সরাসরি নির্বাচনী অপরাধের শামিল।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক ও চায়নিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের গবেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. সিনথিয়া ফরিদ এ বিষয়ে যৌথ নিবন্ধে বলেন, গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের পক্ষ অবলম্বনের সুযোগ নেই।
বর্তমানে একদিকে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চললেও, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে যুক্ত হতে দেখা যাচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন আচরণ রাজনৈতিকভাবে যেমন বিতর্কিত, তেমনি আইনগতভাবেও উদ্বেগজনক।
নিবন্ধে বলা হয়, চলমান গণভোট পরিচালিত হচ্ছে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর অধীনে। তবে এই অধ্যাদেশ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২-এর বাইরে কোনো আলাদা কাঠামো তৈরি করেনি। বরং অধ্যাদেশের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, আরপিওর অধীনে যেসব কাজ নির্বাচন-অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, সেগুলো গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর প্রযোজ্য, ততদূর কার্যকর হবে।
এই প্রেক্ষাপটে আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন লেখকরা।
ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি যদি তার দাপ্তরিক অবস্থান, ক্ষমতা বা প্রভাব ব্যবহার করে ভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।
আইন বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা কেবল নির্বাচনী কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোটের ফল প্রভাবিত করার যেকোনো প্রচেষ্টাই এর আওতায় পড়ে। ফলে উপদেষ্টা বা মন্ত্রীসদৃশ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা যদি সরকারি অবস্থান বা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালান, তাহলে সেটিও ৮৬ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন হবে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়, সংবিধানের ৬৬(৩) অনুচ্ছেদ কিছু রাষ্ট্রীয় পদধারীকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা দিলেও, এটি কোনোভাবেই নির্বাচনী অপরাধ সংক্রান্ত বিধান শিথিল করে না। ওই অনুচ্ছেদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণ করে, আর আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে—দুটো বিষয় আলাদা।
তারা বলেন, গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার চালানোর অধিকার সাধারণ নাগরিক, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের রয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় পদধারীরা সেই পর্যায়ে পড়ে না। তারা গণভোট আয়োজন করতে পারেন, নিয়ম ব্যাখ্যা করতে পারেন কিংবা নিরপেক্ষ তথ্য দিতে পারেন, কিন্তু ফলাফলের পক্ষে প্রচার চালানোর কোনো আইনি সুযোগ তাদের নেই।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, এ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা উঠেছে, তার একটি বড় অংশ সাংবিধানিক রীতি ও রাজনৈতিক শিষ্টাচারের প্রশ্নে। তবে এখন আইনের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সামনে আসায় বিষয়টি আর কেবল নৈতিক বা রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য মতপ্রকাশ দমন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধীনে অনুষ্ঠিত গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা নিশ্চিত করা। তারা বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রক্ষার জন্য সরকারের উচিত আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা না করে ভোটার ও ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর ভরসা রাখা।
