বাংলাদেশের নাজুক অর্থনীতিতে নতুন চাপ: ইউনূস সরকারের তড়িঘড়ি শুল্ক চুক্তি ও উচ্চমূল্য ১৪টি অপ্রয়োজনীয় বোয়িং ক্রয় 

বাংলাদেশের নাজুক অর্থনীতিতে নতুন চাপ: ইউনূস সরকারের তড়িঘড়ি শুল্ক চুক্তি ও উচ্চমূল্য ১৪টি অপ্রয়োজনীয় বোয়িং ক্রয় 
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্বে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি আলোচিত শুল্ক-সংক্রান্ত চুক্তি (tariff deal) নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কিন নাগরিক খলিলুর রহমান ওরফে রজার রহমান, ওয়াশিংটনে গিয়ে এই চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে খবর। কিন্তু এই চুক্তির বিস্তারিত শর্ত, সম্মতির ধরন এবং বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজ, শিল্পপতি বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দেশের অর্থনীতি আরও চাপে পড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

খলিলুর রহমানের নিয়োগ ও তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত

খলিলুর রহমানকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগের পরপরই তিনি ওয়াশিংটনে গিয়ে ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (USTR) অ্যাম্বাসেডর জ্যামিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে বৈঠক করেন (জানুয়ারি ২০২৬)। বৈঠকে বাংলাদেশের রপ্তানিতে ২০% রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ কমানোর প্রস্তাব উঠে এবং ইউএস-এর পক্ষ থেকে এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে উত্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হয়। এছাড়া ইউএস কনটেন্টযুক্ত অ্যাপারেলে ট্যারিফ ছাড়ের প্রস্তাবও আলোচিত হয়। কিন্তু এই চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলী—কী কী আমদানি বাধ্যতামূলক হবে, কোন কোন পণ্যে উচ্চমূল্যে কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে—তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে, সংশ্লিষ্ট পক্ষের পরামর্শ ছাড়াই, অনেকটা অগোচরে। জাপানের সাথে শুল্ক মুক্ত রপ্তানির যুক্তি যেভাবে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার প্রচারণার সাথে করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তির ব্যাপারে কোথাও কোন আলাপ আলোচনা নেই, এই কারনেই ব্যাবসায়িক সমাজে শঙ্কা বাড়ছে।

উচ্চমূল্যে এলএনজি গম আমদানি

ইতিমধ্যে ইউনূস সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর নামে কয়েকটি ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যে আমদানির অভিযোগ উঠেছে:

এলএনজি আমদানি:

ইউএস-ভিত্তিক এক্সেলারেট এনার্জি (যার প্রধান সংযোগকারী সাবেক ইউএস অ্যাম্বাসেডর পিটার হাস এবং যিনি ড. ইউনূসের অতন্ত ঘনিষ্ঠ ও প্রিয়পাত্র)  থেকে এলএনজি কেনা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে গড়ে ২.৫–৩ ডলার বেশি দামে। ২০২৫–২০৪০ সাল পর্যন্ত চুক্তিতে বছরে ০.৮৫–১ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার মোট মূল্য প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা)। জানুয়ারি ২০২৫-এ একটি কার্গোর দাম প্রতি MMBtu ১৫.৬৯ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাজারমূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সঠিক সময়ে পিটার হাসের কোম্পানির কনসাইনমেন্ট না আসাতে সারা দেশজুড়ে গ্যাসের সংকট চরমে ঠেকেছে, এলএনজি সিলিন্ডারের দাম সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

গম আমদানি

যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি হচ্ছে প্রতি টন ৩০৮ ডলার দরে, যখন রাশিয়ান গমের দাম অনেক কম (প্রায় ২৫০–২৭০ ডলার)। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে স্বাক্ষরিত এমওইউ অনুসারে বছরে ৭ লাখ টন গম আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যার প্রথম ধাপে ২.২ লাখ টন কেনা হয়েছে। এতে উৎপাদিত আটা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব আমদানি বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর নামে করা হলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা ব্যবসায়ীরে আমদানির পরে পত্রিকায় প্রকাশিত হবার আগে কিছুই জানতেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিমানের পরিচালক নিয়োগ ও বিমান ক্রয়ের প্রসঙ্গ

জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কিন নাগরিক খলিলুর রহমান ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহযোগী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নতুন পরিচালক নিয়োগের পরপরই ১৪টি বোয়িং বিমান ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩৭০০ কোটি টাকার কাছাকাছি (সার্বভৌম গ্যারান্টি সহ)। এটি ইউএসের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বোর্ডে নতুন নিয়োগের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অনেকের কাছে তড়িঘড়ি এবং অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হচ্ছে। আর এই ক্রয়কে প্রাসঙ্গিক করার উদ্দেশ্যে বংলাদেশ বিমানকে প্রায় অনেকবছর পরে লাভ করছে বলে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু যারা বাংলাদেশ বিমানে যাতায়াত করেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যাবহার করে, তারা সকলেই জানেন বাংলাদেশ বিমানের যাত্রীসেবা থেকে শুরু করে বিমান বন্দরের ব্যাবস্থাপনায় কি অরাজকতা চলছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সম্প্রতি ঢাকা-করাচি রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু করেছে। এটি ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে, দীর্ঘ ১৪ বছর (২০১২ সাল থেকে) বন্ধ থাকার পর। সপ্তাহে দুই দিন (বৃহস্পতিবার ও শনিবার) এই ফ্লাইট চলছে, এবং চাহিদা বেশি থাকায় কিছু ক্ষেত্রে তৃতীয় দিন যোগ করার অনুমতি পেয়েছে। এই নতুন/পুনরায় চালু হওয়া পাকিস্তান রুটের জন্য বিমান ঢাকা-ম্যানচেস্টার রুটটি অস্থায়ীভাবে স্থগিত করেছে। এই স্থগিতাদেশ ২০২৬ সালের মার্চ থেকে কার্যকর (প্রথমে ফেব্রুয়ারি বলা হলেও পরে মার্চ ১ তারিখে শুরু)। কারণ হিসেবে বিমানের ফ্লিট (উড়োজাহাজ) সংকট, অপারেশনাল অগ্রাধিকার (যেমন হজ ফ্লাইট) এবং ম্যানচেস্টার রুটের অর্থনৈতিকভাবে কম লাভজনক হওয়া উল্লেখ করা হয়েছে।

এমতবস্থায় বাংলাদেশ বিমান কিভাবেই বা রাতারাতি লাভজনক সংস্থায় পরিনট হলো, আর কিভাবেই বা ৩৭০০ কোটি টাকা মূলের ১৪ টি বোয়িং কেনার জন্য অর্থ সংকুলান করতে পারবে? যেখানে আন্তর্জাতিক মানের যাত্রীসেবা দিতে না পারার কারনে, বেশ কিছু গুরত্বপূর্ন রুটে আজও বাংলাদেশ বিমানের রুট চালু করা যায়নি। সেবার মান উন্নত না করে, শুধুমাত্র বছরে ৩ মাস হজ্ব ফ্লাইটের উদ্দেশ্যে নতুন কেনা বোয়িং ব্যাবহার করে বাকি সারা বছর হ্যাংগারে বসিয়ে বসিয়ে লোকসান গুনতে হবে বলে মনে করেছেন বিমান সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনৈতিক প্রভাব ও প্রশ্ন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উচ্চমূল্য আমদানি (এলএনজি, গম, বিমান) দেশের নাজুক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইতিমধ্যে গার্মেন্টস খাতে সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপের মধ্যে এ ধরনের বাধ্যতামূলক আমদানি দেশের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করতে পারে। ব্যবসায়ী সমাজের অভিযোগ, এসব সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট পক্ষের পরামর্শ নেওয়া হয়নি, যা স্বচ্ছতার অভাব দেখায়।

প্রশ্ন উঠছে: এই তড়িঘড়ি চুক্তি কি আদৌ দেশের স্বার্থে? নাকি বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর নামে আরও উচ্চমূল্যে পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে? এই চকল চুক্তিতে কি আদৌ বাংলাদেশ লাভবান হচ্ছে, নাকি যুক্তরাশট্রকে খুশি করাই এই সকল চুক্তির মূল লক্ষ্য?

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বচ্ছতা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এ ধরনের চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

Visited 25 times, 1 visit(s) today