❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজারের মহেশখালীতে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে নতুন কার্গো যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে টার্মিনালটি জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।
এর আগে অগ্নিকাণ্ডের কারণে এক্সিলারেট এনার্জির আরেকটি এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ সক্ষমতা কমে যাওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দেশে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এলএনজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দৈনিক মোট সরবরাহ সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট।
এর মধ্যে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি এবং সামিটের ৫০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু বর্তমানে দুই টার্মিনাল মিলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস দিচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট।
গত ২১শে জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর পিটার হাসের এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ৬ই আগস্ট থেকে সেটি আংশিকভাবে চালু করা হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হয়নি। ফলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহের বড় অংশ সামিটের টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে সামিটের টার্মিনাল থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ৫৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছিল।
তবে গত সোমবার এলএনজিবাহী একটি কার্গো বঙ্গোপসাগরে পৌঁছালেও উত্তাল সমুদ্রের কারণে সেটিকে সামিটের টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি। ফলে কার্গো থেকে এলএনজি সরবরাহ নেওয়া সম্ভব হয়নি। টার্মিনালে আগে থেকে মজুত থাকা এলএনজি ব্যবহার করেই সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ চালিয়ে যেতে হয়।
এর পর থেকে ধীরে ধীরে সরবরাহ কমাতে শুরু করে সামিট। সোমবার সন্ধ্যার পর জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমানো হয়। মঙ্গলবার তা নেমে আসে ২০ কোটি ঘনফুটে। বুধবার সরবরাহ আরও কমিয়ে ১০ কোটি ঘনফুট করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় টার্মিনালটির গ্যাস সরবরাহ।
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শুক্রবার সকাল পর্যন্তও এলএনজিবাহী কার্গোটিকে টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
আরপিজিসিএলের একজন কর্মকর্তা বলেন, এলএনজিবাহী কার্গো বার্থিংয়ের জন্য সমুদ্রের যে পরিস্থিতি প্রয়োজন, বর্তমান সমুদ্রের অবস্থা তার দ্বিগুণেরও বেশি প্রতিকূল। এ কারণে কার্গোটিকে টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা যাচ্ছে না।
ওই কর্মকর্তা বলেন, শুক্রবার বিকেলের পর আবহাওয়া কিছুটা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্যাসের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় রাতে হলেও কার্গোটি বার্থিংয়ের চেষ্টা করা হবে। সাধারণত বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকায় রাতে বার্থিং করা হয় না।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে। শনিবার সকাল থেকে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে গত ৬ই আগস্ট থেকে আংশিকভাবে চালু থাকা এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ থেকে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পিটার হাসের এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের মেরামতের কাজ শেষ হলেও সেটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার ক্যাবলসহ অন্যান্য ত্রুটি মেরামত করা হয়েছে। তবে দ্বিতীয় বয়লার সিঙ্ক্রোনাইজ করতে টার্মিনালটি ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হবে।
সামিট টার্মিনাল পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ করতে পারবে এবং গ্যাসের চাহিদার চাপ কম থাকবে—এমন সময় বেছে নিয়ে এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ করে বাকি কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্যাসের সংকটের মধ্যেই সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা ‘আল হামরা’ নামের একটি এলএনজি কার্গো মহেশখালীর কোনো টার্মিনাল গ্রহণ করেনি। কার্গোটিকে ঘিরে বিমা-সংক্রান্ত আপত্তি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এতে চলমান সংকটের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়া এবং পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের কূপগুলোর উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশে গ্যাসের ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে।
২০০৯ সালে দেশে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ১৭৪ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। উৎপাদন বাড়তে বাড়তে ২০১৮ সালে দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। ওই বছরই ঘাটতি মোকাবিলায় প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৩০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা শুরু হয়।
বর্তমানে দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক গ্যাস উৎপাদন কমে প্রায় ১৬০ থেকে ১৭০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা অনেক বেড়েছে। পেট্রোবাংলা গড়ে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুটে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়া, এলএনজি কার্গো খালাসে জটিলতা এবং টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কারণে আমদানিনির্ভর এই সরবরাহব্যবস্থা বারবার ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়। একই সঙ্গে পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
গ্যাস সংকট নিয়ে বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মেরামতের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা ও অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
মন্ত্রী বলেন, ‘এখন শুধু দিন গোনা ছাড়া আর কিছু করার নেই। এফএসআরইউতে প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। পাশাপাশি কীভাবে কম লোডশেডিং করা যায় এবং শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ করা যায়, সেই ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া আমার হাতে আর কী থাকতে পারে?’
এদিকে গ্যাস সংকট ও এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান এবং পরিচালক (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট) ও (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. শোয়েবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
