পরিকল্পিতভাবে জিততে চায় জামায়াত: সাধারণ ভোটারদের দূরে রাখতে ভোটে সংঘাত সৃষ্টির কৌশল

পরিকল্পিতভাবে জিততে চায় জামায়াত: সাধারণ ভোটারদের দূরে রাখতে ভোটে সংঘাত সৃষ্টির কৌশল
শেয়ার করুন

অজয় বাঙালী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন শুধু দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা রূপ নিচ্ছে একটি নতুন ধরনের নির্বাচনি কৌশলে—যেখানে ভোটের আগে ভোটারকে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়াই হয়ে উঠছে বড় লক্ষ্য।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনিক কর্মসূচি, নির্বাচনি সভা ও ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা সেই বাস্তবতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।

শেরপুরের ঝিনাইগাতীর ঘটনা এর একটি দৃশ্যমান উদাহরণ মাত্র। সেখানে একটি সরকারি আয়োজনে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সংঘর্ষে জামায়াত নেতা রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন। ঘটনাটিকে অনেকেই তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল হিসেবে দেখাতে চাইলেও অনুসন্ধানে উঠে আসছে ভিন্ন চিত্র—এই সহিংসতা একক নয়, বরং নির্বাচনের মাঠে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি ধারাবাহিক কৌশলের অংশ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল, মুঞ্জুরুল আলম পান্না, রাজনীতিবিদ গোলাম মাওলা রনিসহ অনেকেই বলছেন, জামায়াতের পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতায় আসার একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করা হচ্ছে।

সংঘাত কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এই নির্বাচনে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এমন একটি প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে আওয়ামী লীগ কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে বেশিবার নির্বাচনে জয়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় এবার নেই ভোটের মাঠে।

২০০৮ সর্বশেষ প্রতিদ্বন্ধীতামূলক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৮ শতাংশ ভোট পায় আর দলটির নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দেশের মোট ভোটারের অর্ধেকের বেশি সমর্থন পেয়েছিল দলটি। ফলে দলটির সমর্থকগোষ্ঠীর কমপক্ষে ৪০ শতাংশ ভোটারের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার কোন সম্ভবনা নেই।

এতে দীর্ঘদিন পর ভোটের মাঠে প্রধান প্রতিযোগিতা দাঁড়িয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এই বাস্তবতায় জামায়াতের সামনে একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে—দেশের ইতিহাসে দলটি কখনোই জাতীয় নির্বাচনে ১২ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি।

যদিও ১৯৯১ সালের সেই ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২.১৩ শতাংশ ভোট নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সর্বোচ্চ ১৮ আসনে জিততে পরেছিলো সেবার সরকার গঠন করা বিএনপির সাথে আসন সমঝোতার কল্যাণে। পরেরবার আসন সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ায় ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদে ৪.৬১ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩ টি আসন।

আর অষ্টম সংসদে বিএনপির সাথে জোট করে মাত্র ৪.২৮ শতাংশ ভোট পেলেও আসন পায় ১৭ টি, তবে ২০০৮ সালে নবম সংসদে ৪.৭ শতাংশ ভোট নিয়ে মাত্র ২ টি আসনে জয়লাভ করে জামায়াতে ইসলামী।

কিন্তু জামায়াতের একটি আলাদা শক্তি আছে—তাদের ক্যাডারভিত্তিক, আদর্শনির্ভর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ভোটব্যাংক। এই ভোটব্যাংক স্বল্প ভোটার উপস্থিতিতেও কার্যকর থাকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই সংঘাতের কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

যখন নির্বাচনি পরিবেশ সহিংস, অনিশ্চিত ও আতঙ্কপূর্ণ হয়, তখন সাধারণ ভোটার—বিশেষ করে নিরপেক্ষ ও মধ্যপন্থী ভোটাররা—ভোটকেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। বিপরীতে, ক্যাডারভিত্তিক দলগুলো সংগঠিতভাবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে পারে। অর্থাৎ ভোটার উপস্থিতি যত কমে, সংগঠিত দলগুলোর আপেক্ষিক শক্তি তত বাড়ে।

ভোটার মনোস্তত্ত্ব: ভয়ই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক

ভোটার আচরণ নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বলছেন, নির্বাচন সহিংস হলে ভোটাররা তিনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। প্রথমত, তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। দ্বিতীয়ত, তারা ভোট দিতে গিয়ে কোনো পক্ষের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় থাকেন। তৃতীয়ত, তারা পুরো নির্বাচনকেই অর্থহীন মনে করে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যান।

এই তিনটি প্রতিক্রিয়াই সাধারণ ভোটারকে মাঠের বাইরে ঠেলে দেয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায়, যেখানে রাজনৈতিক সংঘাত দ্রুত সামাজিক সহিংসতায় রূপ নেয়, সেখানে ভোটার অনুপস্থিতি আরও প্রকট হয়।

শেরপুরের ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে, তা এরই প্রতিফলন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংঘর্ষের পর অনেক সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে বলছেন—“ভোট দিতে গিয়ে জীবন ঝুঁকিতে ফেলার দরকার কী?”

এই মনস্তত্ত্বই সংঘাত-রাজনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য।

বিবিসি বাংলা তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে, জুলাই দাঙ্গার সময় পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল, দেড় বছরেও সেগুলো পুরোপুরিভাবে উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদের এখনও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্রপাতি উদ্ধার না হলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

যদিও খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে গত ১৭ মাসে দফায় দফায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে সেনা-পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। এমনকি লুণ্ঠিত অস্ত্রের সন্ধান পেতে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারও ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

কিন্তু এতসব তোড়জোড়ের পরও অস্ত্র উদ্ধারে আশানুরূপ সফলতা পাওয়া যায়নি। হাতবদল হয়ে অনেক অস্ত্র অপরাধীদের কাছে চলে গেছে বলেও জানা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, “লুট হওয়া অস্ত্রগুলো গত দেড় বছরে পুরোপুরি উদ্ধার হওয়া উচিৎ ছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভোটের আগে অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা কঠিন হতে পারে” ।

প্রশাসনিক কর্মসূচিতেও সংঘাত: কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত

ঝিনাইগাতীর সংঘর্ষটি কোনো দলীয় সমাবেশে নয়; এটি ছিল উপজেলা প্রশাসনের আয়োজিত নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠান। সেখানে প্রশাসন, পুলিশ, রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। তবু সংঘাত এড়ানো যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, অনুষ্ঠানে উপস্থিতি, চেয়ার বণ্টন ও বসার স্থান নিয়ে উত্তেজনা আগেই তৈরি হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সময়মতো স্পষ্ট নির্দেশনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া কিংবা নিষ্ক্রিয়তা—উভয় ক্ষেত্রেই সংঘাত বাড়ে। আর এই সংঘাত যখন বারবার ঘটে, তখন তা আর দুর্ঘটনা থাকে না; বরং একটি প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ফলাফলের অংশ হয়ে ওঠে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করে কীভাবে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, সরকারের উচিৎ সেটা ভোটারদের সামনে তুলে ধরা। কারণ নিরাপত্তা ইস্যুতে আশ্বস্ত করা না গেলে তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে আনা কঠিন হয়ে উঠবে,” ।

বিএনপি বনাম জামায়াত: সংঘাতের লাভ কার?

শেরপুরের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি সতর্ক সংকেত। সংঘাত যদি নির্বাচনি কৌশল হয়ে ওঠে, তাহলে তার সবচেয়ে বড় শিকার হবে সাধারণ ভোটার এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।

একদিকে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি ও গণভিত্তি তুলনামূলকভাবে বড় হলেও দলটি ব্যাপকভাবে সাধারণ ভোটারের ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে, জামায়াত নির্ভর করে সীমিত কিন্তু নিবেদিত ভোটব্যাংকের ওপর। ফলে সহিংস পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিএনপির সম্ভাব্য ভোটাররা। কারণ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভোট বর্জনের দেশের বড় একটা অংশের মানুষ ভোটবিমুখ থাকবে।

অন্যদিকে, জামায়াতের সংগঠিত কাঠামো কম ভোটার উপস্থিতির নির্বাচনেও কার্যকর থাকে। এই বাস্তবতায় সংঘাতের রাজনীতি জামায়াতের জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।

Visited 9 times, 1 visit(s) today