রাজস্ব চাপে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব, বাড়ছে তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি

রাজস্ব চাপে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব, বাড়ছে তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুর্বল রাজস্ব প্রবৃদ্ধি, মন্থর বিনিয়োগ ও বাড়তি ঋণসেবার চাপের মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন বড় পরিসরে বাড়ানোর প্রস্তাব নতুন করে আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জাতীয় পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় যুক্ত হবে, যা দেশের বিদ্যমান রাজস্ব কাঠামোর জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার যেখানে নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটাতেই চাপের মুখে, সেখানে এত বড় আকারের স্থায়ী ব্যয় যুক্ত হলে বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা ও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

পে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী বেতন, ভাতা ও পেনশন কাঠামোয় বড় ধরনের সমন্বয় আনা হলে অতিরিক্ত যে ব্যয় হবে, তা এককালীন নয়—বরং স্থায়ী পরিচালন ব্যয় হিসেবে প্রতিবছর বহন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত ভাতা ও কল্যাণ সুবিধা যুক্ত হলে মোট বাড়তি ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এ ধরনের ব্যয় ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে, কারণ একবার বেতন কাঠামো বাড়ানো হলে তা আর কমানো যায় না।

২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। বেতন ও পেনশন খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ।

অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গড়ে মাসে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। সেই হিসাবে প্রস্তাবিত অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারের প্রায় সাড়ে তিন মাসের সমপরিমাণ রাজস্বের প্রয়োজন হবে—যা বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।

কর-জিডিপি অনুপাত এখনো নিম্নমুখী, করের আওতা সীমিত, আর কর প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান নয়—এমন পরিস্থিতিতে এত বড় রাজস্ব জোগান স্বল্পমেয়াদে নিশ্চিত করা কঠিন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন দল স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ফলে একই সময়ে পরিচালন ব্যয় ও সামাজিক খাতে ব্যয়—দুই দিক থেকেই রাজস্বের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের দ্বিমুখী ব্যয়চাপ সামাল দিতে না পারলে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হওয়া, বাজেট ঘাটতি বাড়া এবং ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, প্রস্তাবিত ব্যয়ের বিপরীতে সুস্পষ্ট অর্থের উৎস দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, এটি শুধু বড় ব্যয় নয়—স্থায়ী ব্যয়, যা প্রতিবছর বহন করতে হবে।

তিনি মনে করেন, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলেও প্রতিবছর গড়ে কয়েক দশ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত জোগান দিতে হবে। ঋণ নিয়ে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ জোগান দিয়ে এই ব্যয় সামাল দিলে তা সুদের বোঝা ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

তার ভাষায়, সরকারের সামনে তখন রাজস্ব বাড়ানো বা অন্য খাতে ব্যয় কমানোর বিকল্প থাকবে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে বড় অঙ্কের রাজস্ব বাড়ানো কঠিন, আর উন্নয়ন ব্যয় কাটছাঁট করলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পে কমিশন ২০ ধাপের নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ করেছে। এতে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য এই কাঠামো কার্যকর হলে বিদ্যমান ব্যয়ের সঙ্গে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হবে।

পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমা, ভাতা পুনর্বিন্যাস, কল্যাণ সুবিধা সম্প্রসারণসহ একাধিক আর্থিক দায় তৈরি করবে এমন প্রস্তাবও রয়েছে।

সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেছেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে পে কমিশনের সুপারিশ সাধারণত শতভাগ বা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয় না। বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হয় এবং অনেক প্রস্তাবই সংশোধিত বা সীমিত করা হয়।

তার মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায়ও একই ধরনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বড় আকারের বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়িত হলে তা বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে দিতে পারে, যার ফলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। এতে সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণসেবায় আটকে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

অন্যদিকে, ঘাটতি অর্থায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপও তীব্র হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। ফলে বেতন বৃদ্ধি কেবল আয়ের সমন্বয়ের বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পথচলার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে বেতন কাঠামো পর্যালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তা যদি রাজস্ব সক্ষমতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিকেই বহন করতে হতে পারে।

তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ—রাজস্ব সংস্কার, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া বড় আকারের ব্যয় প্রতিশ্রুতি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

Visited 13 times, 1 visit(s) today