।। গঙ্গারিডি- গল্প না সত্যি?।।
– হাসান মুরশেদ
পাঞ্জাব জয় করে আলেকজান্ডার যখন পূর্বদিকে অগ্রসর হতে চান, তখন ‘গঙ্গারিডি’ বা ‘গঙ্গারিডাই’ (Gangaridai) নামে এক শক্তিশালী জাতি বা রাজ্যের শৌর্যের কাহিনী শুনে তার অপরাজেয় সেনাবাহিনী আর এগোতে সাহস পায়নি। ইতিহাস আগ্রহী বাঙালির দীর্ঘদিনের শ্লাঘা- এই গঙ্গারিডাই হচ্ছে বাঙালির আদিপুরুষ বা আদিস্থান। এই শ্লাঘা কি ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সম্মত?
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডার তার বাহিনী নিয়ে পাঞ্জাবের ঝিলাম বা বিতস্তা (গ্রিক দলিলে ‘হিদাস্পিস’) নদীর পাড় পর্যন্ত এসেছিলেন এবং সেখানে রাজা পুরুকে (Porus) পরাজিত করেছিলেন। রাজা পুরু ছিলেন চন্দ্রবংশীয় আর্য ক্ষত্রিয়। পুরুকে পরাজিত করার পর আলেকজান্ডার আরও পূর্বদিকে অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বিপাশা (Hyphasis) নদীর তীরে এসে তার সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করে। ঐতিহাসিক ডিওডোরাস, প্লাটার্ক ও মেগাস্থিনিসের বর্ণনায় আসলেই পাওয়া যায়-
গঙ্গার ওপারে ‘গঙ্গারিডাই’ এবং ‘প্রাসি’ (Prasii – মগধের নন্দ বংশ) নামক এক বিশাল শক্তির অবস্থান, যাদের ৪ থেকে ৬ হাজার সুশিক্ষিত যুদ্ধহস্তী ছিল। রাজা পুরুর মাত্র ২০০ হাতির ব্যুহ ভাঙতেই যেখানে গ্রিক সেনারা হিমশিম খেয়েছিল, সেখানে কয়েক হাজার হাতির প্রচারণা তাদের মনে ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘ যাত্রা, যুদ্ধের ক্লান্তি এবং এই অচেনা অপরাজেয় শক্তির খবর তাদের নিরুৎসাহিত করে দেয়।
আমরা আগে জেনেছি- অখণ্ড বাংলা তখনো গড়ে ওঠেনি; বঙ্গ, রাঢ়, পুণ্ড্র, গৌড় ছিল আলাদা জনপদ। তাহলে পাঞ্জাব থেকে এত দূরের এক শক্তির ভয়ে আলেকজান্ডার ফিরে যাবেন কেন?
মূলত তৎকালীন উত্তর ভারতে মগধের নন্দ রাজা এবং গঙ্গা অববাহিকার ভাটির রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী কৌশলগত মিত্রতা গড়ে উঠেছিল। উত্তর ভারতে আর্য প্রাধান্য থাকলেও মগধ ছিল আর্যায়নের শেষ গন্তব্য, এর পরের বঙ্গীয় জনপদগুলো ছিল অনার্য বা ম্লেচ্ছ। নন্দ রাজবংশও উচ্চবর্ণের ছিল না; পুরাণ ও জৈন গ্রন্থ ‘পরিশিষ্টপার্বন’-এ তাদের ‘নাপিত’ বা শূদ্র সন্তান হিসেবে উল্লেখ করে অত্যন্ত হীনভাবে দেখা হয়েছে। সম্ভবত এই ব্রাত্য বা অনার্য পরিচয়ের কারণেই গাঙ্গেয় জনপদের অনার্য শাসকদের সাথে নন্দদের এক নিবিড় সামরিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল।
তৎকালীন বাংলার শৌর্য যে কেবল গল্প ছিল না, তার প্রমাণ মেলে উয়ারী-বটেশ্বর ও চন্দ্রকেতুগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে। বঙ্গ জনপদে ব্রহ্মপুত্রের প্রাচীন প্রবাহের পাশে ২৫০০ বছর আগে গড়ে ওঠা উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি সুপরিকল্পিত দুর্গ-নগরী। এখান থেকে প্রাপ্ত কয়েক হাজার ‘ছাপযুক্ত রৌপ্য মুদ্রা’ এবং ইটের রাস্তা প্রমাণ করে এটি ছিল এক বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র। অন্যদিকে, রাঢ় ও বঙ্গ সীমান্তের প্রবেশদ্বার চন্দ্রকেতুগড় ছিল একটি বিশ্বখ্যাত বন্দর, যেখানে রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াসের সময়কার মুদ্রা পাওয়া গেছে।
গ্রিকদের বর্ণিত সেই হাজার হাজার হাতি কোনো কল্পনা ছিল না, কারণ বঙ্গ ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার গহিন জঙ্গল ছিল হাতির প্রাকৃতিক ভাণ্ডার। এই হাতিগুলোকেই নৌকায় করে গঙ্গা নদীপথে পশ্চিমের সীমান্তগুলোতে পাঠানো হতো। চন্দ্রকেতুগড়ের টেরাকোটার ফলকে খোদাই করা যুদ্ধসজ্জা এবং সামুদ্রিক নৌকার চিত্র প্রমাণ করে যে তারা জল ও স্থল- উভয় পথেই অত্যন্ত পারদর্শী ছিল। সুতরাং, গঙ্গার ওপারে উয়ারী-বটেশ্বর এবং চন্দ্রকেতুগড়ের মতো শক্তিশালী জনপদ ও বন্দরের ঐশ্বর্যই ছিল সেই মহাপ্রবল ‘গঙ্গারিডি’ শক্তির ভিত্তি।
প্রশ্ন হলো- আলেকজান্ডার, রাজা পুরু, মগধের নন্দ রাজাদের নাম পাওয়া যায়। বঙ্গ, রাঢ় ইত্যাদি মিলে যে গঙ্গারিডি বা পরবর্তীতে বাংলা, সেই নিজস্ব ভূমির তৎকালীন মানুষদের কোন পরিচয় আমরা পাই না কেনো?
সুত্র:
১. ইন্ডিয়া – মেগাস্থিনিস (অনুবাদ ও ব্যাখ্যা)।
২. অখণ্ড বাংলার ইতিহাস – নীহাররঞ্জন রায় (বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব)।
৩. উয়ারী-বটেশ্বর: শিকড়ের সন্ধানে – সুফী মোস্তাফিজুর রহমান।
৪. The Classical Accounts of India – R.C. Majumdar (Dr. রমেশচন্দ্র মজুমদার)।
৫. The Rise of Civilization in India and Pakistan – Bridget and Raymond Allchin.
Visited 23 times, 1 visit(s) today
