নিজস্ব প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী অভিযোগ করছেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের নির্বাচন থেকে ছিটকে দিতে মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে, যাতে জামায়াতকে কার্যত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নথি অনুযায়ী, যাচাই–বাছাই শেষে মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭২৩ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীই সবচেয়ে বেশি—৩৩৮ জন, যা মোট বাতিলের প্রায় অর্ধেক। মনোনয়ন ফিরে পেতে ইসিতে জমা পড়া ৬৪৫টি আপিলের মধ্যেও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যাই অর্ধেকের বেশি।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী দুলাল মিয়া অভিযোগ করেন, ফ্যাসিবাদী আমলের চেয়েও তিনি এবার বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সোমবার আপিলে মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রস্তাবক–সমর্থকদের তথ্য আগেই প্রতিপক্ষের কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেকে আতঙ্কে ঘরছাড়া হন। এমনকি একজন প্রস্তাবকের বাড়িতে ডাকাতির ঘটনাও ঘটে। তিনি দাবি করেন, কমিশনে ভিডিও প্রমাণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে সত্যতা প্রমাণের পরই তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়।
বরগুনা-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রাশেদুজ্জামানও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার দাবি, সমর্থকদের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং যাচাইয়ের নামে গভীর রাতে ফোন করায় ভোটাররা ভয় পেয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে দাঁড়ানোর আগেই জনগণের সমর্থন প্রমাণ করতে হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরই বেশি হয়রানি করা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি এডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম বলেন, মাঠপর্যায়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার একটি সুস্পষ্ট চেষ্টা চলছে। তার মতে, বিপুলসংখ্যক আপিল ও উচ্চ হারে আপিল মঞ্জুর হওয়াই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তিনি অভিযোগ করেন, বড় রাজনৈতিক দলের প্রভাবে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় হুমকি।
এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তার বিরুদ্ধে মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। এর আগে বিএনপির প্রার্থী এম এ হান্নান তার মনোনয়ন বাতিল চেয়ে আপিল করেছিলেন। একরামুজ্জামান নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি অতীতে বিএনপি ও পরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে ‘১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর যাচাই’, হলফনামায় ত্রুটি ও কারিগরি জটিলতা। তবে একাধিক প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, সমর্থকরা স্বাক্ষর দেওয়ার পরও দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে অস্বীকার দেখানো হয়েছে।
লালমনিরহাট-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শিহাব আহমেদ বলেন, তার তিনজন সমর্থক লিখিত হলফনামায় স্বাক্ষরের কথা স্বীকার করলেও ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতিবেদনে তা অস্বীকার দেখানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, জনগণের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তাকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বরিশাল অঞ্চলের ঝালকাঠি-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, সামান্য দাপ্তরিক ত্রুটিতে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, যা যাচাইয়ের দিনেই সমাধান করা সম্ভব ছিল।
ঢাকা-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তরা সেলিমা হুদা জানান, ঋণখেলাপির অভিযোগে তার মনোনয়ন বাতিল করা হলেও হাইকোর্ট তাকে ঋণখেলাপি হিসেবে গণ্য না করতে নির্দেশ দিয়েছেন। সেই আদেশ নিয়েই তিনি আপিল করেছেন।
এদিকে অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, প্রায় সব বিভাগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বাতিল হয়েছে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা অঞ্চলে।
ইসি সূত্র জানায়, মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি ১০ জানুয়ারি শুরু হয়েছে, যা চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট-২ অডিটোরিয়ামে এসব শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ দেশকাল নিউজকে বলেন, যাচাইয়ের সময় ভোটারদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন হলে কমিশনে অভিযোগ জানালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটারদের গোপনীয়তা রক্ষায় নির্বাচন কমিশন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে নির্বাচনের মাঠ কার্যত একপেশে হয়ে পড়বে এবং প্রকৃত বিরোধী কণ্ঠগুলো নির্বাচন থেকে বাদ পড়ে যাবে।
