অজয় বাঙালী
২০১৭ সালে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে প্রাণভয় আর ক্ষমা এই দুই তাগিদে সুন্দরবন ছাড়েছিল জলদস্যুরা, দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে হয়েছিল সুন্দরবনকে। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই সুন্দরবনে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বনদস্যু চক্র।
২৪ সালের ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস সরকার গঠনের পরপরই নিরাপত্তা ব্যবস্থার দূর্বলতার কারণে আবারও ফিরে আসে বনদস্যু চক্র।
এরপর থেকেই জেলে, বনজীবী এমনকি পর্যটকদের অপহরণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বনাঞ্চলজুড়ে। দস্যুদের ভয়ে সুন্দরবনে যেতে চাইছেন না জেলেরা, পেশা বদলাচ্ছেন অনেক বনজীবী। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বন বিভাগের রাজস্ব আদায়ে, যা নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত কয়েক মাসে সুন্দরবনে দস্যুদের অপহরণ ও হামলার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। শুধু গত এক মাসেই অর্ধশতাধিক জেলেকে অপহরণ করেছে বিভিন্ন দস্যু বাহিনী। মুক্তিপণ দিয়ে কিছু জেলে ছাড়া পেলেও এখনো অনেকে দস্যুদের জিম্মায় রয়েছেন।
গত ৭ জানুয়ারি দুবলারচরসংলগ্ন এলাকায় জেলেদের ওপর হামলা চালিয়ে অপহরণের চেষ্টা করে দয়াল বাহিনী নামে পরিচিত এক বনদস্যু চক্র। জেলেরা প্রতিরোধ গড়ে তুলে তিন দস্যুকে আটক করে কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করলেও পরদিন প্রতিশোধ হিসেবে ১৫ জেলেকে অপহরণ করা হয়। ১৭ দিন পর মাথাপিছু প্রায় ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ৯ জন জেলে ছাড়া পান। মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পাওয়া জেলেরা জানান, অপহরণের সময় তাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে।
পূর্ব সুন্দরবনের টিয়ারচর এলাকা থেকেও সম্প্রতি দুই জেলেকে অপহরণ করেছে জাহাঙ্গীর বাহিনী নামে আরেকটি দস্যু দল। অপহৃতদের মহাজন ও স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, দস্যুরা আগে চাঁদা দাবি করে, টাকা না পেলে অপহরণ করে। অনেক ক্ষেত্রে বিকাশের মাধ্যমে নিয়মিত চাঁদা দিয়েই জেলেদের মাছ ধরতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সুন্দরবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন জেলেরা। মোংলার চিলা ইউনিয়নের জেলে অমৃত বৈরাগী জানান, আগে নির্ভয়ে সুন্দরবনে যেতেন তারা, এখন দস্যুতার কারণে অনেকেই দিনমজুরসহ অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চাঁদপাই স্টেশন থেকে যেখানে ৪৭৮টি পাশ পারমিট দেওয়া হয়েছিল, ২০২৫ সালের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ২৩৬টিতে।
শুধু জেলে নয়, পর্যটকরাও দস্যুদের টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুন্দরবনে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের অপহরণের ঘটনায় মূল হোতা মাসুম মৃধাসহ একাধিক দস্যুকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড। যৌথ অভিযানে অস্ত্র, গুলি ও অপহৃতদের মালামাল উদ্ধার করা হলেও স্থানীয়দের আশঙ্কা, এসব অভিযানের পরও দস্যু তৎপরতা পুরোপুরি থামছে না।
এদিকে বনদস্যু ও চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্যে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীও। চিত্রল হরিণ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগার এখন শিকারি ও পাচারকারীদের প্রধান লক্ষ্য। শীত মৌসুমে খালের পানি কমে যাওয়ায় হরিণ লোকালয়ে চলে আসছে, আর সেই সুযোগে শিকারিরা ফাঁদ পেতে হত্যা করছে। হরিণ শিকারের ফাঁদে পড়ে বাঘ আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত একযুগে সুন্দরবন থেকে লাখের বেশি ফাঁদ, অবৈধ অস্ত্র ও নৌযান উদ্ধার করা হলেও চোরা শিকার বন্ধ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বনদস্যুদের সঙ্গে যুক্ত সিন্ডিকেট বাঘ ও হরিণের হাড়, মাংস, চামড়া ও অন্যান্য অঙ্গ পাচার করছে বিদেশে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি ও কিছু অসাধু চক্রের কারণে দস্যু ও শিকারিরা বারবার ফিরে আসছে। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বনজীবীদের জীবন-জীবিকা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব—সবকিছুই হুমকির মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন রক্ষায় বনদস্যু নির্মূল, চোরা শিকার বন্ধ, সমন্বিত অভিযান এবং বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তা না হলে দস্যুমুক্ত সুন্দরবন আবারও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ গবেষক এম এ আজিজ বলেন, সুন্দরবন রক্ষায় বন থেকে বনদস্যুদের নির্মূল করতে হবে। হরিণের চোরা শিকার বন্ধ, সুন্দরবনের বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ, বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়ানো ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
