নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশজুড়ে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা বাড়ছে। এসব ঘটনা ঘটলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গণমাধ্যম আক্রান্ত হওয়ার এই ঘটনাকে ঘটনাকে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, সম্প্রতি সারাদেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামলার ঘটনা বেড়েছে। ঘোষণা দিয়ে গণমাধ্যমে হামলা হলেও আইন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা সংস্থাগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও তথ্যপ্রবাহের ওপর বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো নষ্ট হয়েছে। তারা আরো বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখন অর্থ, ক্ষমতা ও ধর্মের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র এখন মব শক্তির উত্থানকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক নীতিগত সংলাপে গতকাল এসব কথা বলেন বক্তারা।
সংলাপে রাজনৈতিক পরিসরে মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বর্তমান অবস্থা মূল্যায়নে রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নিয়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন।
সংলাপের শুরুতে সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর ততই সংকুচিত হয়। তিনি বলেন, আইনকে প্রায়ই রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আর সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
বাংলাদেশে আদৌ আইনের শাসন আছে কি না সে প্রশ্ন তুলে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের মতো গণমাধ্যমে হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে ঘটেছে। তারা দাড়িয়ে দেখেছে।
জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব কালচারের উত্থান ঘটেছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থা নিজেদের অপব্যবহার করছে বলেও সমালোচনা করেন তিনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার সার্বজনীন আপেক্ষিক নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখন অর্থ, ক্ষমতা ও ধর্মের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র এখন মব শক্তির উত্থানকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা সংশোধন হলেও এর প্রয়োগ এখনও ত্রুটিপূর্ণ। অতীতে আদালত নির্বিচারে জামিন দিয়েছে এমন দাবি নাকচ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এখন সাংবাদিকরা কেন গুম ও হত্যাকা- নিয়ে প্রতিবেদন করতে ভয় পান। সাংবাদিকরা এখন কঠিন সময় অতিক্রম করছেন।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, মব সন্ত্রাস ও সহিংসতা এখন আদালতের রায়ের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের দুর্বলতার দিকটি তুলে ধরে তিনি বলেন, সমালোচনা সহ্য করার সংস্কৃতি ছাড়া কোনও জাতি এগোতে পারে না। বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে।
সাংবাদিক মো. মুক্তাদির রশীদ রোমিও প্রশ্ন রেখে বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন নাগরিকদের নাকি মবের হাতে? তিনি বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই বিভক্ত হয়ে পড়ছে; কার্যকর কমিশনের অভাব এবং ভিন্নমতকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা প্রকৃত বিতর্ককে দমন করছে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন দিদার ভূঁইয়া, রাগিব আহসান মুন্না, পারভেজ করিম আব্বাসী, ফারুক হাসান, পল্লব চাকমা, ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান ও শেখ ফজলুল করিম মারুফ প্রমুখ।
তারা সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে মব শক্তির ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

