আবারও ইউক্রেনে সেই ভয়ঙ্কর ওরেশনিক ছুড়ল রাশিয়া, পশ্চিমাদের কঠোর হুঁশিয়ারি

আবারও ইউক্রেনে সেই ভয়ঙ্কর ওরেশনিক ছুড়ল রাশিয়া, পশ্চিমাদের কঠোর হুঁশিয়ারি
শেয়ার করুন

২০২৪ সালের পর আবারও ইউক্রেনে ভয়ঙ্কর ‘ওরেশনিক’ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল রাশিয়া। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা নিয়ে যখন ইউক্রেন তালবাহানা করছে, গোপন দূরভিসন্ধি চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখন ইউক্রেনের অপতৎপরতা বন্ধ করতে এবং ইউক্রেনকে পেছন থেকে লেলিয়ে দেওয়া পশ্চিমা দেশগুলোকে নিজের সামরিক সক্ষমতার শক্ত বার্তা পৌঁছে দিতেই এই হামলার নির্দেশ দেন রাশঅন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

প্রেসিডেন্ট পুতিন ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ও বিধ্বংসী ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বক্তব্য দিয়ে আসছেন। প্রথমবার ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউক্রেনে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে মস্কো। এরপর এটি স্থগিত রাখা হয়েছিল যুদ্ধ বন্ধ হবে এই আশায়। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়াকে উস্কানি দিতে ইউক্রেনকে দিয়ে পুতিনের বাসভবনসহ রাশিয়ায় গোপন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। ফলে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।

গত সোমবার রাতে রাশিয়া পুনরায় ওরেশনিক হামলা চালায়। রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, পশ্চিম ইউক্রেনের লভিভ অঞ্চলে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

মস্কোর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পুতিনের আবাসস্থলে ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়। তবে কিয়েভ ও ওয়াশিংটন এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক একাধিক আন্তর্জাতিক ঘটনার পটভূমিতে এই হামলার সিদ্ধান্ত নেয় রাশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে—ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স পাঠানো এবং উত্তর আটলান্টিকে রাশিয়ার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করা।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রটিতে কার্যকর যুদ্ধাস্ত্রের পরিবর্তে নিষ্ক্রিয় বা ‘ডামি’ ওয়ারহেড থাকতে পারে, যেমনটি ২০২৪ সালে প্রথমবার ব্যবহারের সময় দেখা গিয়েছিল। ফলে হামলার মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক ধ্বংস নয়, বরং রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা দেওয়া।

এর আগে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঘোষণা দিয়েছিল, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে তারা ইউক্রেনে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে। এর জবাবে মস্কো হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, বিদেশি সেনাদের বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ইনসব্রুকের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ গেরহার্ড ম্যাঙ্গট বলেন, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে পাশ কাটিয়ে এগোনোয় মস্কো অসন্তুষ্ট। পাশাপাশি ইউরোপীয় মিত্রদের সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা রাশিয়াকে বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। এই প্রেক্ষাপটেই ওরেশনিক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ম্যাঙ্গটের মতে, এই হামলা মূলত পশ্চিমাদের উদ্দেশে রুশ সামরিক সক্ষমতার একটি স্পষ্ট সংকেত। মস্কো বোঝাতে চেয়েছে, রাশিয়াকে উপেক্ষা করা যাবে না এবং আলোচনা টেবিলে তাদের অবস্থানের প্রতি সম্মান দেখানো প্রয়োজন।

তিনি জানান, ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র পারমাণবিক ও গতানুগতিক—উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম হলেও সাম্প্রতিক হামলায় পারমাণবিক উপাদানের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

একজন উচ্চপদস্থ ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি লভিভ শহরের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আঘাত হেনেছে এবং এতে সম্ভবত নিষ্ক্রিয় ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছে। রাশিয়া ২০২৪ সালে প্রথমবার এই ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষা করার সময়ও একই ধরনের ওয়ারহেড ব্যবহার করেছিল।

সমর বিশারদদের মতে, রাশিয়া বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে শান্তিরক্ষার স্বার্থে। ইউক্রেনে যদি সত্যিই সক্রিয় ওয়ারহেডসহ ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ত রাশিয়া, তবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতো দেশটি।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সামরিক জার্নালের বরাতে বলা হচ্ছে, ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মত প্রযুক্তি পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে নেই এ মুহূর্তে।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ধৈর্য্যের প্রশংসা করছেন বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদরা। যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার সর্বশেষ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার প্রতিক্রিয়ায়।

রাশিয়ান নিউক্লিয়ার ফোর্স প্রজেক্টের পরিচালক পাভেল পোদভিগ বলেন, রাশিয়া ওরেশনিককে এখন মূলত রাজনৈতিক সংকেত দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ধ্বংসাত্মক ক্ষতি নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য নয়। তবে নিষ্ক্রিয় ওয়ারহেড ব্যবহৃত হলেও ইউক্রেন ও তার মিত্রদের জন্য এই অস্ত্রের ভীতি কমে যায় না।

এদিকে ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডের সীমান্ত থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে হামলার ঘটনায় পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির নেতারা হামলাকে ‘উসকানিমূলক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, এটি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে স্পষ্ট উসকানি এবং একই সঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।

Visited 9 times, 1 visit(s) today