বিমর্ষ সময়
প্রাচীন গ্রিক ভাষায় প্রচলিত ’মুজেইক তেকনি’ শব্দের অর্থ হলো ’মিউজদের শিল্পকলা।’ হ্যাঁ, গ্রিক পুরাণে শিল্প ও বিজ্ঞানের মোট ন’জন দেবী বা ’মিউজ’ ছিলেন। গ্রিক কবি হোমার এবং হেসিওদের লেখায় তাঁদের উল্লেখ ঘুরে-ফিরে আসে। তবে, ধীরে ধীরে ’মিউজ পলিমনিয়া’-ই সঙ্গীদের ’মিউজ’ বা দেবী হিসেবে স্বীকৃতি পান। উল্লেখ্য, গ্রিক শব্দ ’মুজেইক’ থেকেই ল্যাটিন ’মিউজিকা’, ফরাসীতে ’মিউজিক’ এবং রুশে ’মিউজিকা’ শব্দের উদ্ভব। ইংরেজিতে ষোড়শ শতক থেকে ’সঙ্গীত’ বোঝাতে ’মিউজিক’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ভারতে আবার শুভ্রবসনা দেবী সরস্বতীর এক হাতে বীণা ও অন্য হাতে পুস্তক বা বই দেখা যায়। বৈদিক সাহিত্যে সঙ্গীতের উল্লেখ রয়েছে। মধ্য যুগে পারস্য-আফগানিস্থান-মধ্য এশিয়া সহ পৃথিবীর নানা ভ‚-খন্ডের যোদ্ধা ও সূফী সাধকগণ ভারতে এসে একসময় থিতু হয়ে পড়ায়, এসব অঞ্চলের সাথে উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতের মিশ্রণে উপমহাদেশের সঙ্গীত এক বিশেষ মাত্রা অর্জন করে।
আমীর খসরু বা মিঞা তানসেনের মত সঙ্গীত সাধকেরা পারষ্পরিক সহাবস্থান ও মানবীয় মূল্যবোধের যে ’ভারতীয় সঙ্গীত’ গড়ে তুলেছেন, তারই প্রেরণায় আজো হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে মুসলিম গায়ক বা সুরসাধকেরা অনায়াসে বহু হিন্দু-দেবীর প্রশস্তি এবং হিন্দু গায়ক বা সুরসাধকেরাও আল্লাহ-রসুল-আলী বা সূফী সাধকদের প্রশস্তি সম্বলিত ’বন্দীশ’ বা গানের বানী গভীর ভক্তি ও নিবেদনের সাথে গেয়ে থাকেন। দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সঙ্গীতের সাথে অবশ্য বর্হিভারতের সুর তত মিশ্রিত হয়নি।
আমাদের বাংলায় আবার ভাটিয়ালী-ভাওয়াইয়া-পালা গান-বাউল গান-মঙ্গল কাব্য-মুর্শিদি-জারি-সারি গানের মত লোকগানের বিপুল ভান্ডারের পাশাপাশি ’পঞ্চ কবি’ তথা রবীন্দ্রনাথ, কাজি নজরুল, দ্বিজেন্দ্র লাল, রজনী কান্ত এবং অতুল প্রসাদের গানের পাশাপাশি বাংলা আধুনিক গান ও ’জীবনমুখী’ গানের মত বিকল্প গানের ধারা তথা নানা সুর ও ভাবের গানে সমৃদ্ধ।
বাংলাদেশে গান বা সঙ্গীত অনুশীলনের কথা বলতে গেলে ’ছায়ানট’-এর প্রসঙ্গ না তুললেই নয়। ১৯৬১ সালে জন্ম-মূহুর্ত থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলা সঙ্গীত ও সংস্কৃতি রক্ষায় নিবেদিত। আজ কল্পনা করাও কঠিন যে ১৯৬৪ সালে, সেই পাকিস্থানী শাসনের সময়পর্বে রমনা বটমূলে বাংলা নববর্ষ পালনের যে প্রয়াস ’ছায়ানট’ কাঁধে তুলেছিল, তা’ কতটা কঠিন ছিল! সেই বর্ষবরণ আজো চলছে। এছাড়া প্রতিবছর রবীন্দ্র ও নজরুল জন্ম-জয়ন্তী এবং মৃত্যুবার্ষিকীসহ বসন্ত বরণ, শারদীয় গানের আয়োজন, বর্ষামঙ্গলের আয়োজনও প্রতিষ্ঠানটি করে থাকে।
ষাটের দশকে পাকিস্তান বেতারে রবীন্দ্র সঙ্গীতের প্রচার বন্ধ করা হলে প্রতিবাদস্বরূপ বিখ্যাত গায়ক কলিম শরাফী তাঁর কিছু সতীর্থকে সহ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ঠিক হয় যে প্রতিষ্ঠানটিতে ছাত্র-ছাত্রীরা সঙ্গীত, নাটক ও নৃত্য শিখবে। পাক সরকারের বিরোধিতার মুখেও দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে এর নানা শাখা ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্ম-শতবার্ষিকী পালনের পর কিছু আগ্রহী সংস্কৃতিক কর্র্র্মী যাঁদের ভেতর মোখলেসুর রহমান (সিধু ভাই নামে পরিচিত বা জনপ্রিয়), শামসুন্নাহার রহমান, সুফিয়া কামাল এবং ওয়াহিদুল হক প্রমুখের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক নাম রাখা হয় ’ছায়ানট’ (যার অর্থ বৃক্ষের ছায়া; পাশাপাশি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই নামে একটি রাগ আছে এবং নজরুলের ’বিদ্রোহী’ কবিতাতেও এই শব্দটির উল্লেখ রয়েছে)।
মুক্তিযুদ্ধের রক্তঝরা দিনগুলোয় ’ছায়ানট’:
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়, ওয়াহিদুল হক ও সানজিদা খাতুন সহ বেশ কিছু সংস্কৃতিকর্মী সীমান্ত অতিক্রম করে নিরাপদ আশ্রয় চান। পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় তাঁরা ’মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’ গড়ে তোলেন। দূর্গত উদ্বাস্তÍ শিবিরগুলোয় ঘুরে ঘুরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটিগুলোতে গিয়ে প্রতিরোধী গান শুনিয়ে তাঁদের উদ্দীপিত করাও ছিল এই সংস্থার শিল্পীদের কাজ। এই কর্মযজ্ঞই তারেক মাসুদ পরিচালিত ’মুক্তির গান’ সিনেমার মূল প্রতিপাদ্য।
স্বাধীন বাংলাদেশ (১৯৭১–আজ)
দেশ স্বাধীণ হবার পর থেকে প্রথম তিন দশক ’ছায়ানট’ পরিচালিত হতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ’ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল এ্যান্ড কলেজ’ ক্যাম্পাসেই। স্কুলটির অধ্যক্ষা ডক্টর নূরুন্নাহার ফয়জুন্নেসা এবং দেশ স্বাধীণ হবার পর তদানীন্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোজাফফর আহমাদ চৌধুরীর অনুমতিতেই এটি সম্ভব হয়েছিল।
১৯৯৯ সালে, তদানীন্তন বাংলাদেশের সরকার ০.৩৩ একর জমি ’ছায়ানট’-কে দান করেন। আজকের ধানমন্ডিস্থ শঙ্কর এলাকায় ১৯৯৯ সালে ক্ষমতাধিষ্ঠিত সরকারের দেওয়া এই এক বিঘা পরিমাণ জমির কারণে ’ছায়ানট’-এর বিশাল এই ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়েছে । স্থপতি বাশিরুল হক ভবনটির নক্সা প্রণয়ন করেন।
তবে, প্রতিষ্ঠানটি আক্রমণও কম সহ্য করেনি। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে একটি সন্ত্রাসী আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়। শিল্পীরা যখন মাত্রই ’এ কী অপরূপ রূপে মা তোমায়/হেরিনু পল্লী জননী’ গাচ্ছিলেন, তখনি দু’টো বোমা বিষ্ফোরিত হয়। যখন কিনা পুরো অনুষ্ঠান মাত্রই বিটিভিতে প্রচারিত হচ্ছিলো। সাত জন ওখানেই নিহত হন এবং ৫০ জন আহত হন। ’হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী’ নামে একটি গোষ্ঠি এই হামলাটি করেছিল।
এই ২০২৫-এর ১৯শে ডিসেম্বর ’ছায়ানট’কে সইতে হলো আর একটি বর্বর আক্রমণ।
’আমরা, ’ছায়ানটে’র শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তারা, সেদিন রাত ন’টায় সব কাজ সেরে চলে গেছিলাম। হাতে গোণা দু/একজন নৈশ রক্ষী শুধু পাহারায় ছিল। রাত ১১টা থেকে সাড়ে এগারোটা নাগাদ সন্ত্রাসী আক্রমণ শুরু হয়। তাকিয়ে দেখুন- কত বাদ্যযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে- এত এত হার্মোনিয়াম, তবলা, মাইক্রোফোন সব পুড়ে, ছাই হয়ে, লুট হয়ে শেষ। প্রায় চার কোটি টাকা মূল্যের বাদ্যযন্ত্র বিনষ্ট হয়েছে,’ দুই তরুণ শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন। গত ২৩শে ডিসেম্বর ’ছায়ানট’-এর প্রতিবাদী গানের আয়োজনের দিনই তাঁদের সাথে কথা হয়।
’তবে মূল ক্ষতি হয়েছে নথি-পত্র বিভাগে। এই ক্ষতি অমূল্য,’ তাঁরা আরো বলেন।
ইতোপূর্বে প্রখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী লাইসা আহমেদ লিসা বলেছিলেন যে ওসমান হাদির মৃত্যুতে ’ছায়ানট’ কর্তৃপক্ষ-ও সমব্যথী। কিন্তÍ, হাদির মৃত্যুর সাথে ’ছায়ানট’-এ হামলার যোগসূত্র তিনি বুঝতে পারেননি।
গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করা:
সেই ছাত্র জীবন থেকে শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেট থেকে শুরু করে নগরীর আরো কিছু বামপন্থীদের ডেরায় মাও জে দংয়ের বিখ্যাত ’গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও’-এর কথা শুনতে পেলেও বাস্তবে এই কাজটি বাংলাদেশের বামপন্থীরা করতে পারেননি। তবে, এই কাজটি করতে সক্ষম হয়েছে দেশের ’তৌহিদ জনতা’ নামে ডানপন্থী মব।
নইলে দেখুন সেই ২০১৬ সালে কুমিল্লা বিভাগে উস্তাদ আলাউদ্দিন খানের জন্ম-ভিটা ’সঙ্গীতাঙ্গণ’-এ ঠিক একই ধাঁচের হামলা ঘটেছিল! আজ ন’বছর পার না হতে খোদ রাজধানীর বৃহত্তম সঙ্গীতশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁরা হামলা চালাতে সফল হয়েছে। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের উত্তরাধিকারী ও মাইহার ঘরানার শিল্পী সিরাজ আলী খান এবার ’ছায়ানট’-এ হামলার প্রতিবাদে আর কোন দিন বাংলাদেশে আসবেন না বলে জানিয়েছেন।
সুরের বাংলাদেশ আজ হয়ে উঠেছে অসুর তাণ্ডবের জনপদ
