জিয়া পরিবারের রাজনীতি (১ম পর্ব) || বিএনপির রাজনীতিতে কোণঠাসা আরাফাত রহমান কোকোর পরিবার
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামেই যার রাজনীতির ভিত্তি। অথচ দলটির চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ভাই কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য কার্যত কোনো রাজনৈতিক জায়গা তৈরি হয়নি। বিপরীতে, জিয়ার স্ত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাই ও বোনেরা দলটির ভেতরে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত থেকেছেন—কেউ সরাসরি দলীয় পদে, কেউবা ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থেকে।
জিয়াউর রহমানের পরিবার: রাজনীতির বাইরে এক অধ্যায়
জিয়াউর রহমান ছিলেন বাবা-মায়ের পাঁচ ছেলের মধ্যে দ্বিতীয়। তার কোনো বোন ছিল না। বাবা মনসুর রহমান ও মা জাহানারা খাতুন ওরফে রানীর ৫ ছেলের মধ্যে জিয়ার বড় এক ভাই ও ছোট তিন ভাই ছিলেন। তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ আহমেদ কামাল দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন, তবে তিনিও বিএনপির রাজনীতিতে কখনো গুরুত্বপূর্ণ বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানে আসেননি। তিনি ২০০৬ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের জিএম পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর ঢাকার বাসাবো এলাকায় একাই বসবাস করতেন।
২০১৬ সালের ২রা সেপ্টেম্বর আহমেদ কামাল স্পষ্টভাবেই জানান, তিনি রাজনীতি করতে চান না এবং শারীরিকভাবেও সক্ষম নন। ওই সময় নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে গুঞ্জন উঠলেও তিনি পরে নিজেই তা নাকচ করে দেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো দলের কেউ নই। বিএনপিকে শক্ত হাতে ধরে রাখতে হবে—এর বেশি বলার ক্ষমতা আমার নেই।’
২০১৭ সালের ২৩শে নভেম্বর আহমেদ কামাল মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমানের ভাইদের অধ্যায় কার্যত ইতিহাসে পরিণত হয়।
জিয়ার অন্য ভাইদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বড় ভাই রেজাউর রহমান নৌবাহিনীতে চাকরি শেষে বিদেশে চলে যান। তৃতীয় ভাই মিজানুর রহমান ছিলেন ব্যাংকার; তার পরিবার লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। আরেক ভাই খলিলুর রহমান ছিলেন ফার্মাসিস্ট; তার পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। এসব পরিবারের সঙ্গে জিয়ার পরিবারের দেশে থাকা সদস্যদের যোগাযোগও ছিল খুবই সীমিত।
খালেদা জিয়ার পরিবার: বিএনপিতে প্রভাবশালী উপস্থিতি
অন্যদিকে, বিএনপির রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার পরিবার ছিল এবং আছে দৃশ্যমানভাবে সক্রিয়। খালেদা জিয়া নিজে তিনবার প্রধানমন্ত্রী ও দীর্ঘদিন বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার শাসনামল ও দলীয় নেতৃত্বে ভাই-বোনদের একটি অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
খালেদা জিয়ার ভাই সৈয়দ ইস্কান্দার বিএনপির রাজনীতিতে আলোচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে ওঠে। খালেদা জিয়ার বোনদের পরিবারের সদস্যদেরও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে—দলীয় পদ, মনোনয়ন কিংবা নীতিনির্ধারণী মহলের কাছাকাছি অবস্থানের মাধ্যমে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি পারিবারিক ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়েছে, যেখানে জিয়াউর রহমানের রক্তসম্পর্কের ভাইদের জায়গা হয়নি, কিন্তু খালেদা জিয়ার আত্মীয়স্বজনদের জন্য দরজা ছিল তুলনামূলকভাবে খোলা।
আদর্শ বনাম বাস্তবতা
জিয়াউর রহমান জীবদ্দশায় পরিবারের সদস্যদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন—এমন বক্তব্য তার ছোট ভাই আহমেদ কামাল নিজেই দিয়েছিলেন। অথচ বাস্তবতায় দেখা গেছে, বিএনপির ক্ষমতা ও রাজনীতিতে জিয়ার ভাইদের পরিবার প্রায় অদৃশ্য থেকেছে, আর খালেদা জিয়ার পরিবার দলটির ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
এই বৈপরীত্য বিএনপির ভেতরেই নানা সময়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দলটির একাধিক প্রবীণ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিএনপি আদর্শিক দল হলেও বাস্তবে পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বের হতে পারেনি।’
জিয়াউর রহমানের নামেই গড়ে ওঠা বিএনপিতে তাঁর ভাই ও তাদের পরিবার রাজনীতির বাইরে থেকেছেন—স্বেচ্ছায় কিংবা বাস্তবতার কারণে। অথচ খালেদা জিয়ার ভাই-বোনেরা দলটির রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন। এই বাস্তবতা বিএনপির পরিবার-নির্ভর রাজনীতির এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে, যা দলটির ভেতরে আদর্শ ও বাস্তবতার ফারাককে আবারও সামনে এনে দেয়।
