সাইফুর রহমান মিশু
গত কয়েকদিন গভীরভাবে ভাবছিলাম, ঠিক কী কারণে বাংলাদেশের এতো এতো তরুণ উগ্রবাদের সমর্থক হয়ে উঠলো এ নিয়ে। কী করে একজন শিক্ষিত রুচিশীল তরুণও ওসমান গণি তথা হাদির ছবি প্রোফাইলে চড়াবে। কেন কোন বিবেচনা থাকবে না, কেন সামান্যতম ধারণা থাকবে না তার কর্মকান্ড সম্পর্কে। কিংবা থাকলেও সেটাকে খুব স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিবে। সে সময়ে মনে পড়লো, ২০১৪ সালের দিকে ইউরোপের বিভিন্ন সংবাদপত্রের মারফতে জানতে শুরু করেছিলাম ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণরা সিরিয়া যাচ্ছিল আইসিসের মতো দলের হয়ে যুদ্ধ জড়াতে। এ নিয়ে একটু বিস্তারিত পড়াশুনা করলাম।
২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর এবং উদ্বেগজনক অধ্যায়। এই সময়ে ইউরোপের উন্নত ও সমৃদ্ধ শহরগুলো থেকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী—যাদের অনেকের বয়স ছিল ১৮-এর নিচে—সবকিছু ছেড়ে সিরিয়া ও ইরাকের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে পাড়ি জমাচ্ছিল। তাদের গন্তব্য ছিল কুখ্যাত জঙ্গি গোষ্ঠী ‘ইসলামিক স্টেট’ বা আইএস।
লন্ডন, প্যারিস বা ভিয়েনার মতো আধুনিক শহরে বেড়ে ওঠা এই প্রজন্ম কেন এমন আত্মঘাতী পথ বেছে নিয়েছিল? কীসের মোহে তারা আকৃষ্ট হয়েছিল? এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ধারণা করা হয়, আইএসের উত্থানের সময়কালে ইউরোপ থেকে ৫,০০০-এরও বেশি মানুষ তাদের কথিত ‘খেলাফতে’ যোগ দিতে গিয়েছিল। এদের বড় একটি অংশ ছিল কিশোর-কিশোরী, যারা পশ্চিমা বিশ্বের ভোগবাদী জীবন ছেড়ে এক অনিশ্চিত যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপ দিয়েছিল।
যেভাবে তাদের মগজধোলাই করা হতো
আইএস তাদের সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতির বদলে আধুনিক প্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রধান হাতিয়ার করেছিল, যাকে বিশ্লেষকরা ‘ডিজিটাল খেলাফত’ বলে অভিহিত করেন।
- সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুমিং: টুইটার, ফেসবুক এবং আস্ক.এফএম-এর মতো প্ল্যাটফর্মে আইএসের দক্ষ রিক্রুটাররা ওঁত পেতে থাকত। তারা ইউরোপে বসবাসরত একাকীত্বে ভোগা বা হতাশ তরুণদের টার্গেট করত। তাদের সাথে অনলাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চ্যাট করে ‘বড় ভাই’ বা ‘বোনের’ মতো মানসিক সমর্থন দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করত।
- চটকদার প্রোপাগান্ডা: তাদের ভিডিও এবং অনলাইন ম্যাগাজিনগুলো (যেমন: ‘দাবিক’) ছিল অত্যন্ত উচ্চমানের। সেখানে আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকাকে যুদ্ধের ময়দান হিসেবে নয়, বরং একটি ‘ইসলামি ইউটোপিয়া’ বা স্বপ্নের রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো হতো—যেখানে অ্যাডভেঞ্চার আছে, ভ্রাতৃত্ব আছে এবং জীবনের এক মহৎ উদ্দেশ্য আছে।
মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ
গবেষকরা দেখেছেন, যারা আইএসে যোগ দিয়েছিল তাদের বেশিরভাগেরই ধর্ম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ছিল না। তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণগুলো ছিল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক।
- আত্মপরিচয়ের সংকট (Identity Crisis): ইউরোপে বসবাসরত অভিবাসী পরিবারের দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী তীব্র আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগত। তারা না ছিল পুরোপুরি ইউরোপীয়, না ছিল তাদের মূল দেশের সংস্কৃতির সাথে যুক্ত। আইএস তাদের এক শক্তিশালী ‘পরিচয়’ এবং একটি বৈশ্বিক উম্মাহর অংশ হওয়ার অনুভূতি দিয়েছিল।
- উদ্দেশ্যের খোঁজ এবং রোমান্টিকতা: পশ্চিমা বিশ্বের একঘেয়ে জীবনের বাইরে তারা জীবনের একটি ‘মহৎ উদ্দেশ্য’ খুঁজছিল। সিরিয়ায় মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের খবর তাদের আবেগী করে তুলতো এবং তাদের বোঝানো হতো যে তাদের রক্ষা করা নৈতিক দায়িত্ব।
- ’জিহাদি বধূ’র আখ্যান: তরুণীদের ক্ষেত্রে প্রচার কৌশল ছিল ভিন্ন। তাদের বলা হতো, তারা সেখানে গিয়ে যোদ্ধাদের বিয়ে করবে এবং একটি নতুন ‘বিশুদ্ধ সমাজ’ গড়ার কারিগর হবে। এই মিথ্যে রোমান্টিকতার আড়ালে তাদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহারের ভয়াবহ বাস্তবতাটি লুকিয়ে রাখা হতো।
হাই-প্রোফাইল কিছু উদাহরণ
যুক্তরাজ্যের তিন স্কুলছাত্রী—শামীমা বেগম, আমিরা আবাসে এবং খাদিজা সুলতানার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল, যারা ২০১৫ সালে স্কুল পালিয়ে সিরিয়ায় চলে যায়। একইভাবে, অস্ট্রিয়ার দুই কিশোরী সামরা এবং সাবিনাও আইএসের পোস্টার গার্লে পরিণত হয়েছিল। এদের বেশিরভাগেরই পরিণতি হয়েছে অত্যন্ত করুণ।
ইউরোপীয় তরুণদের আইএসে যোগদান ছিল আধুনিক ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক অধ্যায়। এক মিথ্যে স্বপ্নের পেছনে ছুটে তারা নিজেদের জীবন তো ধ্বংস করেছেই, পাশাপাশি তাদের পরিবার ও সমাজকেও গভীর সংকটে ফেলেছিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, উগ্রবাদ শুধু অস্ত্রের জোরে নয়, বরং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহারের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।
এসব থেকে অন্তত এই উপসংহারে আসা যায়, আমাদের দেশের তরুণ সমাজের একটি অংশ শুধুমাত্র সঠিক জ্ঞানের অভাবে আজ বিপদগ্রস্ত ও ভয়ানক ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে। তারা এক কল্পনার জগতে বুঁদ হয়ে আছে। এবং সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এরা নিজেরাও জানেনা যে একটি সুবিধাবাদি গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এদের সামনে যখন যেই চরিত্র উপস্থাপন করা হচ্ছে তারা সেটাকেই আঁকড়ে ধরছে। তা আবু সাঈদ, মুগ্ধ থেকে সাম্প্রতিক সময়ের গণি ওরফে হাদি। এরা না জানে ইতিহাস, না লক্ষ্য করে বিশ্ব রাজনীতি। এরা এতোটাই রঙিন এক স্বপ্নে বিভোর যে, বাস্তবতা থেকে যে এরা যোজন যোজন দূরে অবস্থান করে তা নিজেরাই উপলব্ধি করে না। এটা খুবই ভয়ানক। আমরা আমাদের দেশটা নিয়ে গর্বিত হবার সকল উপাদান হারাতে বসেছি এই স্বার্থপর ও ইতিহাসবিমুখ প্রজন্মের কারণে।
তথ্যসূত্রঃ
- দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian): স্কুলছাত্রী জিহাদি: যেসব নারী ইসলামপন্থীরা আইএস-এ যোগ দিতে ঘর ছাড়ছে (Schoolgirl jihadis: the female Islamists leaving home to join Isis) – পশ্চিমা তরুণীরা কেন যোগ দিয়েছিল তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
- দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times): আইএস যেভাবে টুইটারকে ব্যবহার করে (How ISIS Games Twitter) – তাদের সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলের প্রাথমিক প্রতিবেদন।
- বিবিসি নিউজ (BBC News): শামীমা বেগম: আইএস-এ যোগ দেওয়া লন্ডনের স্কুলছাত্রী (Shamima Begum: The London schoolgirl who joined IS) – যুক্তরাজ্যের অন্যতম আলোচিত ঘটনার সময়রেখা।
- ইউরোপীয় পার্লামেন্ট রিসার্চ (European Parliament Research): বিদেশি যোদ্ধারা: সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া এবং ইইউ পদক্ষেপ (Foreign fighters: Member State responses and EU action) – সংখ্যা এবং আইনি প্রতিক্রিয়া বিষয়ক আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন।
- এনবিইআর গবেষণা (NBER Research): আইএসের বিদেশি যোদ্ধারা কোথা থেকে আসছে? (Where Are ISIS’s Foreign Fighters Coming From?) – একটি গবেষণা যেখানে দেখানো হয়েছে যে যোদ্ধারা প্রায়শই ধনী এবং উন্নত দেশ থেকে এসেছিল।
