মবসন্ত্রাসে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত

মবসন্ত্রাসে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক::

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত ১৬ মাস ধরে মব সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির ঘটনায় আতঙ্কে পড়েছেন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা। সরকার মবসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্রয় ও পৃষ্টপোষকতা দিয়েছে এমন অভিযোগও আছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের বিরুদ্ধে মবসন্ত্রাসের মাত্রা ছাড়িয়েছে ইউনূস সরকারের সময়। তাদের প্রতিষ্ঠান দখল, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে প্রকাশ্যে। যার ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব পড়েছে।

সংবাদপত্রের হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে সারাদেশে অন্তত ১ হাজার ২৪৩টি শিল্পকারখানা মব হামলার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ারস কারখানায়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন ওই কারখানায় হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অন্তত ১৮২ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়।

গত বছরের ২৫ আগস্ট ভোরে রাজধানী থেকে গোলাম দস্তগীর গাজীকে গ্রেপ্তারের পরই রূপসীর ওই কারখানায় হামলা চালানো হয়। ওই রাতেই কারখানায় আগুন লাগানো হয়, যা পাঁচ দিন পর নিয়ন্ত্রণে আসে। টানা আগুনে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় ভেতরে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি। নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা অন্তত মরদেহ উদ্ধারের আশা করলেও সেটিও পূরণ হয়নি।

ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে এটিকে নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং ‘অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট’ হিসেবে উল্লেখ করে। তবে কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তা জেনেও তদন্ত কমিটি কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজীর গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মসজিদে মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোকজনকে জড়ো করে সন্ত্রাসীরা। এরপর পরিকল্পিতভাবে কারখানায় প্রবেশ করে শ্রমিকদের বের করে দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে লুটপাট চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। খবর দেওয়া হলেও তারা এগিয়ে আসেনি। বরং দাড়িয়ে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ দেখেছে তারা।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভবনের নিচতলায় আগুন লাগিয়ে গেট তালাবদ্ধ করে চলে যায় হামলাকারীরা। ভবনের ভেতরে বিপুল দাহ্য পদার্থ থাকায় দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিটের টানা প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরোপুরি নেভাতে পাঁচ দিন সময় লাগে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি, কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। একইভাবে অন্যান্য কারখানায় সংঘটিত হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাতেও বিচার হয়নি। বিচারহীনতার কারণে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, যেগুলোর অনেকগুলো আর চালু হয়নি। সরকারি ও বেসরকারিভাবেও কোনও মামলা হয়নি। বরং মামলা করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ আছে। এত মৃত্যু হলেও স্বাভাবিক বিচারের জন্যও কোনও পরিবার মামলা করতে পারেনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ মাসে ঢাকায় সংঘটিত দাঙ্গার প্রায় ৭৫ শতাংশ ঘটেছে মতিঝিল, গুলশান ও তেজগাঁও এলাকায়। মতিঝিলে একটি বাণিজ্যিক ভবন দখলের চেষ্টা, গুলশানে সাবেক সাংসদের পরিবারের বাসায় হামলা এবং বারিধারা কূটনৈতিক এলাকায় পরিকল্পিত ফ্ল্যাট দখলের ঘটনাগুলো ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাচ্ছেন এবং একটি নির্বাচিত, স্থিতিশীল সরকার চান। এখনো ব্যবসায়ীদের নানা ট্যাগ দিয়ে একটি গোষ্ঠী মবসন্ত্রাসের বৈধতা দিতে চাচ্ছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, মতিঝিল, গুলশান ও তেজগাঁওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় মব সন্ত্রাস ব্যবসায়িক আস্থা ধ্বংস করছে। এতে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সব ধরনের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকা- সংকুচিত হয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা ও সময়মতো নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমেই এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করে ঢাকা চেম্বার।

 

Visited 19 times, 1 visit(s) today