ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী গুপ্তসংগঠন শিবিরের দুর্ধর্ষ ক্যাডার সালাহউদ্দিন আম্মার ক্যাম্পাসে বেপরোয়া হয়ে ওঠেছেন। শিক্ষকদের হয়রানি, নির্যাতন ও মবের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের কায়েম করেছেন। বিএনপি ও ছাত্রদল শিক্ষকদের পক্ষে কথা বলায় তাদের বিরুদ্ধেও হুমকি-ধমকি দিয়েছেন তিনি।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, আম্মার গুপ্ত সংগঠন শিবিরের পাশাপাশি বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনে থানা লুটের অস্ত্রের অংশও তার কাছে রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। অস্ত্র হাতে আম্মারের অনেক ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে ইতিমধ্যে। ক্যাম্পাসকে গুপ্ত সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে নিতে মরিয়া আম্মার, অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
চলতি বছরের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই আম্মার বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। প্রতিদিন এখতিয়ারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি এবং বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছেন বলে দাবি করছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, রাকসুর জিএস হিসেবে আম্মার দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে নানা ইস্যুতে অযাচিত বিতর্ক তৈরি করছেন। তার আচরণ ও কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরাও তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
১৯শে ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভ মিছিলে আম্মারের বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রতিবাদ ওঠে দেশ ব্যাপী।
ওই সমাবেশে তিনি বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মদদপুষ্ট কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী থাকলে আগামী রোববার থেকে কলার ধরে টেনে টেনে প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখা হবে।’ এ বক্তব্যের পর বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠন ও রাবি শাখা ছাত্রদল পৃথক বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানায়।
সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয় ছয়জন ডিনকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ২০২৩ সালের ১৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ডিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থি প্যানেলের প্রার্থীরা ছয়টি পদে নির্বাচিত হন এবং ১৭ই ডিসেম্বর তাদের মেয়াদ শেষ হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার নির্দেশ দেন উপাচার্য।
তবে ১৮ই ডিসেম্বর জিএস আম্মার ‘আওয়ামীপন্থি ডিনদের পদত্যাগ ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের অপসারণের’ দাবি তুলে সময় বেঁধে দেন। ২১শে ডিসেম্বর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তিনি লেখেন, ‘আজ সাড়ে ১০টা থেকে একে একে ছয় আওয়ামীপন্থি ডিনের কাছে পদত্যাগপত্র নিতে যাব।’
ওই দিন তিনি নিজেই পদত্যাগপত্র লিখে ডিনস কমপ্লেক্সে যান। ডিনদের না পেয়ে গণমাধ্যমের সামনে একে একে ফোন করেন এবং পরে একই দাবিতে ডিনদের চেম্বারসহ উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর ও রেজিস্ট্রারের দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। দিনভর উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় ডিনদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রশাসন তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগে ঘুরে আওয়ামীপন্থি শিক্ষক খোঁজা, লাঠি হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর নামে ত্রাস সৃষ্টি করাসহ নানা কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে আম্মারের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বরে ভর্তিতে পোষ্য কোটা ইস্যুতে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলাকালে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। ওই সময় তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগও ওঠে সালাহউদ্দিন আম্মারের বিরুদ্ধে।
রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্র সংসদের দায়িত্ব মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, প্রকাশনা, মানবসেবা, বিতর্ক ও পাঠচক্র, ক্রীড়া আয়োজন এবং আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ। সাবেক রাকসু প্রতিনিধিদের মতে, বর্তমান জিএসের কর্মকাণ্ড এসব দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা।
রাকসুর সাবেক ভিপি ও সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রাগিব আহসান মুন্না বলেন, শিক্ষক বা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। হুমকি দেওয়া, দরজায় তালা ঝোলানো বা অপদস্থ করা স্বেচ্ছাচারী আচরণ, যা রাকসুর ক্ষমতার বাইরে। আম্মার এটাই করছে। প্রতিনিয়ত বেয়াদবি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে কাজ করার চেয়ে নিজেকে আলোচনায় রাখতেই বেশি আগ্রহী আম্মার। সম্প্রতি রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসউদের সঙ্গে তার উচ্চবাচ্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনা আরও বাড়ে।
রাবির অর্থনীতি বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনার জায়গা। কিন্তু এখানে একাডেমিক প্রশাসন ও রাকসু সবই জাতীয় রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। আম্মার সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাচ্ছে। প্রয়োজনে শক্তি প্রদর্শন করতে চাচ্ছে সে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকে তার আচরণে ভয় পেয়েছে। অনেকে ক্ষোভে ফুসছে।
রাবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ফ্যাসিবাদের বিচার আইন অনুযায়ী হতে হবে। মব তৈরি বা সন্ত্রাসী কায়দায় কিছু করা যাবে না। অনেক শিক্ষক ক্লাস নিতে ভয় পাচ্ছেন, যা খুবই উদ্বেগজনক।
এদিকে বিএনপিপন্থি শিক্ষক সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে শিক্ষক হেনস্তা ও অবমাননার অভিযোগ তুলে শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে।
রাবি শাখা ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, একজন রাকসু প্রতিনিধি হিসেবে আম্মারের ভাষা ও আচরণ আরও শালীন ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল। প্রতিবাদ হতে পারে, কিন্তু সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লা আল মামুন বলেন, আম্মারের বক্তব্যে একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে তা উদ্বেগজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। চাইলেই কেউ কাউকে পদত্যাগ করাতে পারে না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার জানান, তিনি শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই কাজ করছেন এবং অধিকাংশ শিক্ষার্থী তার কার্যক্রম সমর্থন করে।
তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো শেষ পর্যন্ত সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে পারব না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাব।’
গতকাল বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের এখতিয়ারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এতে রাবিতে ছয়জন ডিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা এবং শিক্ষকদের হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকদের পদত্যাগ দাবি ও কুৎসিত ভাষা ব্যবহার শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের চরম অবমাননা। এ ধরনের আচরণ শিক্ষার পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত।
