নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন। তিনি লুইজিয়ানার রিপাবলিকান গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে গ্রিনল্যান্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এ ঘোষণার পর ডেনমার্ক সরকার, গ্রিনল্যান্ডের নেতৃত্ব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন একযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
রোববার ট্রাম্প জানান, ডেনমার্কের অধিভুক্ত হলেও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এগিয়ে নিতে ল্যান্ড্রি দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়োগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জেফ ল্যান্ড্রি বলেন, তিনি স্বেচ্ছাসেবী ভূমিকায় এমন একটি দায়িত্ব পেয়ে সম্মানিত, যার লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা।
এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ডেনমার্ক। কোপেনহেগেন জানিয়েছে, বিষয়টি পরিষ্কার করতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র গ্রিনল্যান্ডবাসীর এবং তাদের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা অবশ্যই সম্মান করতে হবে।
হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্বের কথা তুলে ধরে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। তিনি অঞ্চলটির অবস্থান ও খনিজ সম্পদকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। এমনকি প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি, যা ন্যাটোর মিত্র ডেনমার্কের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে।
প্রায় ৫৭ হাজার মানুষের বসবাস গ্রিনল্যান্ডে। ১৯৭৯ সাল থেকে এটি ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে, যদিও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে। অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী ভবিষ্যতে স্বাধীনতা চাইলেও যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার বিষয়ে জনমত জরিপে ব্যাপক বিরোধিতা দেখা গেছে।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন ল্যান্ড্রির নিয়োগকে “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ডেনমার্ক, ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ ও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে গঠিত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেনও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের সঙ্গে সহযোগিতায় তারা প্রস্তুত, তবে তা হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে। তাঁর ভাষায়, বিশেষ দূত নিয়োগে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান বদলায় না—গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডবাসীরই।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জনগণের প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ সংহতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়োগ ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের গ্রিনল্যান্ড-কেন্দ্রিক উচ্চাকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। এর আগে ২০১৯ সালে তিনি দ্বীপটি কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড উভয়ই প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল—গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।
আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলার ফলে নতুন নৌপথ ও খনিজ সম্পদের সুযোগ তৈরি হওয়ায় সেখানে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নিরাপত্তা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে নতুন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
