দশ বছরের দীর্ঘ স্বপ্ন পূরণের পথে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী: ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার এলওআই স্বাক্ষরিত

দশ বছরের দীর্ঘ স্বপ্ন পূরণের পথে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী: ইউরোফাইটার টাইফুন কেনার এলওআই স্বাক্ষরিত
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রায় এক দশকের অপেক্ষা, কূটনৈতিক তৎপরতা, রাজনৈতিক উত্থান-পতন পেরিয়ে অবশেষে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। গতকাল ১০ ডিসেম্বর ইতালির লিওনার্দো এসপিএ-র সঙ্গে ইউরোফাইটার টাইফুন মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী।

বিমান বাহিনীর একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, “এটি আলোচনা শুরুর প্রথম ধাপ মাত্র, কিন্তু এর মাধ্যমে দীর্ঘ পথচলার একটি বড় মাইলফলক অতিক্রম করা হলো।”

এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ঠিক দশ বছর আগে – ২০১৫ সালে। তৎকালীন প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার মনে হয়েছিল, রুশ ও চীনা যুদ্ধবিমান দিয়ে আর আকাশ প্রতিরক্ষা করা যাবে না। তিনি সিদ্ধান্ত নেন – বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে পশ্চিমা প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান দিয়ে সাজাতে হবে।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে ফার্নবরো এয়ার শোতে গিয়ে তিনি নিজে ইউরোফাইটার টাইফুনের ককপিটে বসেন, সেন্সর-অস্ত্র দেখেন এবং এরপর থেকে এই বিমানের সবচেয়ে বড় প্রচারক হয়ে ওঠেন।

দশবছর ধরে আধুনিক বিমান ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও বিমান বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টার বিস্তারিত তথ্য

২০১৭ সালে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে এমআরসিএ (মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট) প্রোগ্রাম চালু হয়। ২০১৯ সালে ব্রিটেন প্রকাশ্যে বলে, “ইউরোপ থেকে আধুনিক বিমান দিতে আমরা প্রস্তুত।” ইতালি পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতালি সফর করলে ইতালীয় গণমাধ্যমে খবর বেরোয় – বাংলাদেশ ইউরোফাইটার, এডব্লিউ১০১ হেলিকপ্টার ও সি-২৭জে স্পার্টান কিনতে আগ্রহী। শেখ হাসিনার সফরের এক মাস পরেই ফ্রান্সের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফ্লোরেন্স পার্লি ঢাকায় এসে রাফালের প্রস্তাব দেন।

২০২১ সালে বিএএফ সরকারের কাছে ১৬টি পশ্চিমা বিমানের জন্য ২৫,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চায়। ২০২২ সালের বাংলাদেশ এয়ার শোতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জটিলতা, সিএএটিএসএ নিষেধাজ্ঞার ভয় এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া বাদ পড়ে যায়। চীনের জেএফ-১৭ বা জে-১০সি কেনার গুঞ্জন ওঠে। তবু শেখ হাসিনা সরকার পশ্চিমা বিমানের স্বপ্ন ছাড়েনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে আধুনিকীকরণের কাজ শেষ করে যেতে পারেননি আগস্ট ২০২৪ ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে উগ্রাবাদী, মৌলবাদী ও পশ্চিমা শক্তির ষড়যন্ত্রের কারনে।

২০২৫ সালের মে মাসে ইউরোফাইটারের ডেমোনস্ট্রেশন ফ্লাইট বাংলাদেশে হয়। আগস্টে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির ঢাকা সফরে চূড়ান্ত চুক্তির আশা জাগে – কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সফর বাতিল হয়। তবু থেমে থাকেনি প্রক্রিয়া। অবশেষে গতকাল এলওআই স্বাক্ষরিত হলো।

অনেকে এখন বলছেন, “এটা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের জাদু।” কিন্তু সত্যটা হলো – এই স্বাক্ষর কোনো রাতারাতি ঘটনা নয়। এটা ২০১৫ সাল থেকে এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরারের স্বপ্ন, শেখ হাসিনা সরকারের দশ বছরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, ব্রিটেন-ইতালি-ফ্রান্সের সঙ্গে আলোচনা এবং ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অবিচল লক্ষ্যের ফল।

এখন শুধু অপেক্ষা – কবে আকাশে উড়বে বাংলাদেশের প্রথম ইউরোফাইটার টাইফুন।

 

Visited 14 times, 1 visit(s) today