একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যা: শহিদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পুত্রের সাক্ষ্য

একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যা: শহিদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পুত্রের সাক্ষ্য
শেয়ার করুন

প্রিসেট৭১

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আদর্শিক সহযোদ্ধা, দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা ও কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা সঞ্চারণে সচেষ্ট। ১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে ‘এতোদিনে’ শিরোনামে তাঁর লেখা একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুড়েই দৈনিক ইত্তেফাকে বিভিন্ন নিবন্ধ, প্রতিবেদনে এ যুদ্ধের ন্যায্য দাবিকে সমর্থন করে লিখতেন তিনি। এমন কিছু প্রতিবেদনের প্রত্যুত্তরে জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ও তাঁর লেখাকে সরাসরি আক্রমণ করে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হতো।

১০ই ডিসেম্বর মধ্যরাতে (সাড়ে ১২টার দিকে) তাঁদের ঢাকার ৫ নম্বর চামেলীবাগের বাসার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খোলেন সিরাজুদ্দীন হোসেন। তবে কাউকে দেখতে না পেয়ে দরজা বন্ধ করে বাড়ির সবাই ঘুমাতে চলে যান। রাত ৩টা-সাড়ে ৩টার দিকে আবার দরজায় করাাঘাতের শব্দ শুনলে তাঁর পুত্র শাহীন রেজা নূর উঠে বাড়িওয়ালার ডাক শুনতে পান। দরজা খুলে তিনি দেখতে পান, বন্দুকের মুখে বাড়িওয়ালা, তার দুই ছেলে এবং তার শ্যালক দাঁড়িয়ে আছেন।

বন্দুকধারীরা ছিলো ৬/৭ জন। তাদের কারো মাফলার বা অন্য ধরনের কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকা। কেউ কেউ মাংকি ক্যাপ পরা। বন্দুকধারীরা আধো বাংলা আধো উর্দুতে বাড়িতে কে কে আছে জিজ্ঞেস করে এবং জোরপূর্বক বাসার ভেতরে ঢুকে শোবার ঘরের সামনে চলে যায়। এ সময় তাঁর স্ত্রী বেগম নূরজাহান সিরাজী শোবার ঘরের দরজা খুলে দিলে তারা ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে।

ঘরে ঢুকেই তারা ‘হ্যান্ডস আপ’ করতে বলে। এ সময় লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরে থাকা সিরাজুদ্দীন হোসেন পাঞ্জাবি পরার জন্য আলনার দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পাঞ্জাবি পরতে পারেননি। বন্দুকধারীরা ভাঙা ভাঙা উর্দুতে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তাঁর পরিচয় দেন। পরিচয় পেয়ে তাঁকে তাদের সঙ্গে বাইরে যেতে বলে এবং বাড়ির লোকজনের কাছে একটি গামছা চায়। বেগম নুরজাহান সিরাজী তাদের হাতে একটি গামছা তুলে দিতে বাধ্য হন। এরপর বন্দুকধারীরা চোখ বেঁধে নগ্ন পায়ে তাঁকে নিয়ে যায়।

এটাই ছিলো প্রথিতযশা সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের হোসেনের শেষ যাত্রা। পরিবারের সদস্যরা তাঁর সাথে যেতে চাইলে বন্দুকের মুখে সবাইকে ঘরের ভেতর ঢুকতে বাধ্য করা হয়।

[পলাতক জামায়াতে ইসলামীর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ৬ষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে ২৯শে জুলাই ২০১৩ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ এই সাক্ষ্য দেন শহিদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছোট পুত্র তৌহীদ রেজা নূর। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিলো ৩ বছর। বাবাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা পরবর্তীতে মা ও মেঝ ভাইয়ের কাছে বিস্তারিত শোনেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই মায়ের মুখ থেকে শুনেছেন, ওই রাতে তাদের বাড়িতে যারা গিয়েছিলেন, তারা ছিলো আলবদর সদস্য। এছাড়া বিভিন্ন বইপত্র, পত্র-পত্রিকা পড়ে, বিভিন্ন তথ্যচিত্র দেখে এবং ‘প্রজন্ম ৭১’ এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কে আরো জানতে পারেন।

তৌহীদ রেজা নূর ১৯৯৫ সালে যুক্তরাজ্যের ‘টোয়েন্টি টোয়েন্টি’ টেলিভিশনের তথ্যচিত্র ‘ওয়ার ক্রাইমস ফাইল’ তৈরির কাজে জড়িত ছিলেন। এই তথ্যচিত্রের গবেষণার কাজ করতে গিয়ে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে আলবদর বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও চিফ এক্সিকিউটর আশরাফুজ্জামান খানের জড়িত থাকার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিভিন্নজনের সাক্ষাৎকার নেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে ছিলেন মৃত ডলি চৌধুরী (শহিদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর স্ত্রী), আ ন ম গোলাম রহমান (শহিদ বুদ্ধিজীবী আনম গোলাম মোস্তফার ভাই), মৃত আতিকুর রহমান, দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ।

দৈনিক পূর্বদেশসহ বিভিন্ন পত্রিকায় এই দুই ব্যক্তির বিষয়ে ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানান তিনি। তৌহীদ রেজা নূর আরো জানান, ১৯৭২ সালে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের একটি সংখ্যায় বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘাতক হিসেবে চৌধুরী মঈনুদ্দিনের ছবিসহ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।]

Visited 19 times, 1 visit(s) today